শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৪ সালের নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এমনকি নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তখন খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছিলেন যে, হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষমতা এত দ্রুত ভেঙে পড়বে। একইসঙ্গে কোণঠাসা হয়ে পড়া বিরোধী দল আবারও এত বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন পালাবদল নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। তবে এবার বড় পার্থক্য হচ্ছে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে এটিই প্রথম নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এর আগে, তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন, যখন তার মা বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ ও অসুস্থতাজনিত কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন। খালেদা জিয়ার শাসনামলে স্বজনপ্রীতির সুবিধা নেওয়ার নেওয়া ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। এরপর ক্ষমতার পালাবদলে আওয়ামী লীগের সময় স্বেচ্ছানির্বাসনে ১৭ বছর অতিবাহিত করেন তিনি।
দেশে প্রত্যাবর্তনের দেড় মাসের মধ্যে হওয়া নির্বাচনে তার নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। দলটি এখন সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে। তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন বটে, তবে অনেকের চোখে তিনি এখনও পরীক্ষিত নন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নবীন মুরশিদ মনে করেন, পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাবই হয়তো তার পক্ষে কাজ করছে। কারণ মানুষ পরিবর্তনের সুযোগ চায় এবং নতুন কিছু প্রত্যাশা করছে।
এদিকে বিএনপি বলছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন ঘোষণার পরপরই বিবিসিকে দলটির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো আগে পুনর্গঠন করতে হবে।
তবে বাংলাদেশে এমন প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতায় আসার পর অনেক দলই ধীরে ধীরে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠে। ফলে জনগণের একাংশের মনে সন্দেহ থেকেই যায়, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা রক্ষা করা হবে।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২৪ সালের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে’ অংশ নেওয়া তরুণরা আগের মতো পরিস্থিতি মেনে নিতে রাজি নয়। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তাজিন আহমেদ (১৯) বলেন, ‘আমরা পুনরায় সংঘাত চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাচ্যুতিই চূড়ান্ত বিজয় নয়; প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।’
তার চাচাতো বোন তাহমিনা তাসনিম (২১) বলেন, ‘আমরা প্রথমে চাই জাতীয় ঐক্য। একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র ও শক্ত অর্থনীতি আমাদের অধিকার। আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে আবারও আন্দোলনে নামার জন্য প্রস্তুত।’
কঠিন পরিস্থিতির শঙ্কা
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের জন্য অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। পাশাপাশি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বিপুল বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফার মতে, সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব প্রায় সব দলকেই প্রভাবিত করছে। তিনি বলেন, এবার সংসদে এমন অনেক নতুন মুখ দেখা যাবে, যারা আগে কখনও সংসদ সদস্য ছিলেন না। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছ। অন্যদিকে কিছু নেতা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই সামনে সময়টা কঠিন হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর নীতি নিয়ে প্রশ্ন
শেখ হাসিনার সময় নিষিদ্ধ হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে। তাদের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসন জিতেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। ইশতেহারে ইসলামি শরিয়াহ আইনের কোনো কথা সরাসরি উল্লেখ ছিল না। তবে দলটির ওয়েবসাইটে বলা আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ কারণে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, ক্ষমতায় এলে দলটি আসলে কী নীতি অনুসরণ করবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নবীন মুরশিদ মনে করেন, ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াতের ভালো ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয়। তিনি বলেন, ‘দলটি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিতভাবে কাজ করে আসছে। তাদের মধ্যে গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতা বিদ্যমান, যা উদ্বেগের বিষয়।’
সামিনা লুৎফার মতে, বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলই নারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এবারে নির্বাচনে প্রার্থীদের মাত্র ৪ শতাংশের একটু বেশি ছিলেন নারী। তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের শক্তিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ দিতে দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে। সংসদ সদস্যদের এখন দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচিত করা যায়।’
বাংলাদেশের সংসদে মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে, যার মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত হয় এবং বাকি ৫০টি নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী মনোনয়ন করা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী পারফরম্যান্স অনুযায়ী।
শেখ হাসিনার অধীনে গত কয়েক নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচন অনেক ভিন্ন ছিল। সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক এই নির্বাচনের আগে ফলাফল অজানা ছিল, যদিও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না দেওয়া তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর প্রশ্ন তোলে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে রেখে বিএনপির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা তাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে তাদের পুনঃপ্রবেশে কিছুটা সময় লাগবে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে, কারণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের নিজস্ব মানুষের হত্যার, নৃশংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ আছে।
ভারতে নির্বাসিত থেকে শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়ে নতুন নির্বাচনের আহ্বান করেছেন। এখনো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনসাধারণের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে দলটিকে চিরতরে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
মন্তব্য করুন








