যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলার মধ্যেই ইরান সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে জোর দিয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো দ্রুত সংস্কার করা হলেও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সংস্কার সীমিত রয়েছে। তবে প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম সীমিত রয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানের রাজধানী মাস্কাটে দুদেশের পরোক্ষ আলোচনা আপাতত শেষ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্গঠন কার্যক্রম দেশটির কৌশলগত অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে ইরান।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুই ডজনের বেশি স্থানে নির্মাণকাজের প্রমাণ মিলেছে। ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণও এই তথ্যকে সমর্থন করে।
হামলার পরপরই কিছু স্থাপনায় সংস্কার শুরু হয়। এতে বোঝা যায়, ইরান স্বল্পমেয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং জুনের হামলার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাজের গতি বাড়িয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত এমন কোনো জোরাল প্রমাণ পাননি যে, ইরান পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরিতে বড় ধরনের অগ্রগতি করেছে।
আলোচনায় দুর্বল অবস্থানে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের অবস্থান সম্পর্কে অবগত এক আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, ইরান সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ও বিশুদ্ধতা সীমিত করা কিংবা আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী।
চলতি বছরের শুরুতে ব্যাপক বিক্ষোভের ফলে ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চাপে পড়ে ইরান। ফলে অর্থনীতি দুর্বল হয়। দেশটির মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণে কমে আসে। এমতাবস্থায় পরমাণু আলোচনায় ইরানের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইরানি নেতৃত্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল প্রশ্নে ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে নতুন সংঘাতের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তবে দুই পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
গত জুনে ইরানের ফোরদো, নাতানজ ও ইস্ফাহানে চালানো হামলা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। বলা হয়, কর্মসূচি কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৃশ্যমান কিছু কার্যক্রম থাকলেও এই তিনটি স্থাপনা এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
হোয়াইট হাউসের ভিন্ন দাবি
তবে হোয়াইট হাউস এই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট একে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, হামলায় ব্যবহৃত বোমাগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত করেছে।
হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথিতেও বলা হয়েছে, ওই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ করেছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন ইঙ্গিত
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান দুটি স্থাপনায় ছাদ নির্মাণ করেছে, যা ওপর থেকে নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে নাতানজে একটি স্থাপনা সাদা রঙের কাঠামো দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) এটিকে পাইলট ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ ছাড়া ইস্ফাহানের কাছে একটি কমপ্লেক্সের প্রবেশপথে নতুন বাধা ও নাতানজের কাছে একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় টানেলের প্রবেশমুখ শক্তিশালী করার চিত্র মিলেছে। এগুলো গোপন সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে পারমাণবিক ওয়ারহেডে ব্যবহৃত হতে পারে এমন উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে সম্প্রতি নির্মিত প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ একটি চেম্বার দেখা গেছে। এই স্থাপনাটি গত জুনের হামলার লক্ষ্যবস্তু না হলেও ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
মন্তব্য করুন








