ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পবিত্র রমজান মাসের চিত্র যুদ্ধের আগের বছরের চেনা দৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নেই রাতভর ব্যস্ত বাজার, নেই বারান্দাজুড়ে রঙিন কাগজের ফুল বা আলোকসজ্জা। সিয়ামের মাসকে ঘিরে যে আনন্দঘন পরিবেশ থাকত, তার বদলে এখন বিরাজ করছে নীরবতা, শোক আর অনিশ্চয়তা।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর এটি গাজার প্রথম রমজান। এই দীর্ঘ সংঘাতে হাজারো প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং অবকাঠামো ভেঙে পড়ার পর মানুষ প্রশ্ন করছে— আসলেই কি কিছু বদলেছে?
গাজার এক বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজকে বলেন, নামমাত্র যুদ্ধবিরতি থাকলেও গুলিবর্ষণ ও হামলা পুরোপুরি থামেনি। শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গাজায় রমজান মানেই ছিল রঙিন ফানুস, বাতি আর শিশুদের উচ্ছ্বাস। কিন্তু এবার সেই দৃশ্য নেই বলেই চলে। বাজারে যে সামান্য সাজসজ্জার জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম অনেকের নাগালের বাইরে।
গাজার দুই সন্তানের মা ফাতমা বলেন, আগে প্রতি বছর সন্তানদের জন্য নতুন ফানুস কিনতেন। এখন একটি ছোট ফানুসের দামই ২৫ থেকে ৩০ শেকেল। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি নিয়েই সন্তুষ্ট হয়েছেন।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুরা খালি প্লাস্টিকের বোতল কেটে-ছেঁটে ফানুস বানিয়ে তাঁবুর সামনে ঝুলিয়ে দিচ্ছে। আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে তাঁবুর দেয়ালে আঁকা হয়েছে অর্ধচন্দ্র ও ‘রমজান মোবারক’— যেন বাস্তুচ্যুত জীবনের অন্ধকারে সামান্য আলো জ্বালানোর চেষ্টা।
কিছু এলাকায় বাজার খোলা থাকলেও ক্রেতা কম। গাজা সিটির দোকানদার আবু আহমদ বলেন, মানুষের হাতে টাকা নেই। ফলমূলের দাম আকাশছোঁয়া, মাংস প্রায় বিলাসপণ্য। খেজুর ও জুস সীমিত আকারে মিললেও বেশির ভাগ পরিবারই ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
ফিলিস্তিনি সমাজবিজ্ঞানী মুস্তাফা ইব্রাহিম জানান, গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। বেকারত্ব ৮০ শতাংশের বেশি। বাজারে কিছু পণ্য এলেও উচ্চমূল্য ও নগদ অর্থের সংকটে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তার ভাষায়, ‘এটি সমৃদ্ধির লক্ষণ নয়, এটি টিকে থাকার যুদ্ধ।’
রমজান শুধু রোজা নয়; এটি পারিবারিক মিলনমেলা, একসাথে ইফতার ও মসজিদে রাতের ইবাদতের সময়। কিন্তু বহু মসজিদ ও হাজারো বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ায় এবার নামাজ আদায় হবে তাঁবু বা অস্থায়ী কাঠামোয়। বহুতল বড় মসজিদগুলোর বেশিরভাগ এখন ধ্বংসস্তূপ।
গাজায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষের অনেকে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বাস করছেন। কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরে ফিরলেও সেখানে নেই দরজা-জানালা, নেই বিদ্যুৎ বা পানির ব্যবস্থা। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এখনও প্রকট। প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সব প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষ চেষ্টা করছে রমজানের অনুভূতি ধরে রাখতে। কেউ তাঁবুর সামনে ছোট আকারে সাজসজ্জা করছেন, কেউ সন্তানদের জন্য একটি ফানুস কিনছেন, কেউ সামান্য খাবার জোগাড় করে ইফতার করছেন।
মধ্য গাজার বাসিন্দা মুশিরা বলেন, ‘আমরা এখনও চেষ্টা করছি— শিশুদের একটু আনন্দ দিতে, কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতা ভুলতে।’
এই রমজান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। টানা অনিশ্চয়তা, সীমিত ত্রাণ আর ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে এটি যেন খালি বোতলের তৈরি একটি ফানুসের ক্ষীণ আলো। গাজার শিশুদের প্রার্থনা খুবই সাধারণ— একটি রমজান যেন কাটে বোমাবর্ষণ ছাড়া। অনেকের আশা, অন্তত পরিস্থিতি যেন আর খারাপ না হয়।