সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে দুই পক্ষই কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। বৈঠকের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী’।
তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভিন্ন সুর তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাত্র ৩০ মিনিটে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনটি পোস্ট দিয়েছেন খামেনি। পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সমালোচনা করেন এবং ইরানের আশপাশে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করেন।
ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে খামেনি বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, ৪৭ বছরেও যুক্তরাষ্ট্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে নির্মূল করতে পারেনি; এটা ভালো স্বীকারোক্তি। আমি বলছি, ‘ভবিষ্যতেও আপনি এই লক্ষ্য হাসিল করতে পারবেন না’।”
এরপর খামেনি মার্কিন সামরিক আধিপত্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী বলেই দাবি করা হয়, কিন্তু সেই শক্তিকেও এমন আঘাত করা হতে পারে যে তা আর উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না।’ মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই যুদ্ধজাহাজ অবশ্যই বিপজ্জনক, তবে সেই যুদ্ধজাহাজকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠাতে সক্ষম অস্ত্র আরও বেশি বিপজ্জনক’।
এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের উপস্থিতি ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিত ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে এবং তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক মহড়া চালিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট। ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই মহড়া ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরানও সামরিক প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই।
জেনেভার এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকভ এবং জ্যারেড কুশনার। তারা এর আগে ওমানে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনাতেও অংশ নিয়েছিলেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পরোক্ষভাবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন, একটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত চুক্তি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই তিনি জেনেভায় গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে তিনি লিখেছেন, আলোচনার টেবিলে হুমকির সামনে আত্মসমর্পণের কোনো বিষয় নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন, কূটনৈতিকভাবে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে, তবে তা সহজ হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিষয়টি কঠিন হতে যাচ্ছে, যদিও অসম্ভব নয়।’
সব মিলিয়ে, সামরিক প্রস্তুতি ও কড়া বক্তব্যের মধ্যেও দুই দেশ আবার আলোচনায় ফিরেছে। এই পরোক্ষ সংলাপ পারমাণবিক ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙতে পারে কি না, তা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সূত্র: এনডিটিভি।
মন্তব্য করুন








