ঐতিহাসিক সোনামসজিদের পাশ দিয়েই চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক। প্রতিদিন এ মহাসড়ক দিয়ে ৫ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক চলে মসজিদটি ঘেঁষে। ৮ টনের অধিক মাল নিয়ে যখন ট্রাকগুলো চলে তখন মনে হয় মসজিদে ভূমিকম্প হচ্ছে। ওজন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নেই। এতে করে দেখা দিয়েছে অসংখ্য ফাটল। ঐতিহাসিক মসজিদটি রক্ষায় বাইপাস সড়ক নির্মাণও ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সোনামসজিদটি প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুলতানি আমলের স্থাপত্য সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর মৌজার এ ছোট সোনামসজিদ। যা শিল্প ভাস্কর্যের অন্যতম নিদর্শন। মসজিদটিতে রয়েছে মোট ১৫টি গম্বুজ। যা সোনা মসজিদের অপরূপ শোভা ধারণ করেছে। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮২ ও প্রস্থ ৫২ ফুট, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। মসজিদে ঢোকার জন্য সামনের দেওয়ালে সমমাপের পাঁচটি দরজা রয়েছে। মসজিদটি মূলত ইটের ইমারত হলেও দেওয়ালের বাইরের অংশ পাথর দিয়ে আবৃত। পাথরের উপর খোদায় করা লতাপাতা, গোলাপ ফুল, ঝুলন্ত শিকল, ঘণ্টার কারুকার্য রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা যায়, কিছু সংখ্যক স্বর্ণ-শিল্পী এই মসজিদের সাজ-সজ্জার পরিকল্পনা বা নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। পরে এ গম্বুজগুলো সোনালী রঙে গিল্ট (সোনায় বাঁধানো) করা হলে এটি সোনামসজিদ নামে পরিচিতি পায়। বঙ্গের গৌরবময় রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ, আরবি সাল- ৮৯৯-৯২৫ হিজরি) ওয়ালী মুহম্মদ আলী এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
এই মসজিদের প্রাচীর সীমানার মধ্যে সমাহিত রয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। এছাড়াও অর্ধ-কিলোমিটার পাশে রয়েছে হজরত শাহনেয়ামতুল্লাহ (র.) এর মাজার, তোহাখানা, দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। সোনামসজিদসহ এসব স্থাপনা দেখতে প্রতিদিন ৮ শতাধিক পর্যটক আসেন এবং স্থাপনাগুলো দেখে মুগ্ধ হন। কিন্তু পর্যটকরা স্থাপনাটি দেখে মুগ্ধ হলেও বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ফাটল দেখে মর্মাহত। দেশীয় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন, সুইজারল্যান্ড, কুয়েত, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা প্রতিদিন এটি দেখার জন্য আসেন।
পাবনা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক আরিফুল ইসলাম জানান, বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেখানে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশে কেন উল্টো চিত্র। ১০ মিনিট সোনামসজিদ চত্বরে থাকা অবস্থায় অন্তত ৫ বার কম্পনের অনুভূতি পেলাম। এ অবস্থা চলতে থাকলে তো একসময় প্রাচীন এ স্থাপনা টি ধ্বংস হয়ে যাবে।
পটুয়াখালীর আহসানুল কবির রিপন জানান, গৌড়ের সবগুলো স্থাপনায় বেশ সুন্দর। সব স্থাপনায় রক্ষণাবেক্ষণ জরুরী। তবে সোনামসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণে একদমই উদাসীন মনে হচ্ছে। কারণ এর দেয়ালে অসংখ্য ফাটল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মসজিদ সংলগ্ন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গির কলেজের একজন সহকারী অধ্যাপক নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, অপরিকল্পিতভাবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার কাজ করছে। কম্পনে পাথরগুলো আলগা হলে সিমেন্ট বালু দিয়ে মেরামত করা ছাড়া কোন কাজ করেনা। মসজিদের ভেতরও কোন মেরামত করা হয় না। আর যে কারণে ফাটল দেখা দিচ্ছে সে কারণ অর্থাৎ ভারী যানের কারণে অনুভূত কম্পন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মসজিদের পাশেই মহাসড়কে উল্টো স্পিড ব্রেকার দিয়েছে। এতে করে ভারী যান যখন জোরে চলে তখন স্পিড ব্রেকারের কারণে আরও জোরে কম্পন অনুভূত হয়। তাই এটা কোন সমাধান হতে পারে না। আর সড়কে অতিরিক্ত পণ্য মাপার যন্ত্র কোটি কোটি টাকা খরচ করে বসানো হলেও একদিনের জন্যও পণ্যবাহী ট্রাক মাপা সম্ভব হয়নি। এতে করে মহাসড়কের স্থায়িত্ব যেমন কমছে, তেমনি মহানন্দা নদীর ওপর নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গির সেতু ও ঐতিহাসিক সোনামসজিদেরও স্থায়িত্ব কমছে।
স্থানীয় অধিবাসী শাহবাজপুর গ্রামের মজিবুর রহমান জানান, এ মসজিদটি রক্ষায় স্থানীয় রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে। মসজিদ ঘেঁষে যে সড়ক রয়েছে এটি দ্রুত সরাতে হবে। সেই সঙ্গে এ সড়ক দিয়ে সকল পণ্যবাহী ট্রাক সহ ভারী যানবাহন চলাচল দ্রুত বন্ধ করলেই স্থাপনাটি রক্ষা করা সম্ভব।
ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হিজবুল্লাহ জানান, মসজিদে নামাজ পড়ার সময় ভারী যান চলাচল করলে মনে হয় ভূকম্পন হচ্ছে। তাই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানিয়েছে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ছোট সোনামসজিদ ধসে পড়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সোনামসজিদ গৌড় গ্রুপ অফ মনুমেন্টস বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক শাহীনুজ্জামান খান বলেন, মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ঐতিহ্যের ছোট সোনামসজিদ। আমরা দফায় দফায় বিকল্প সড়ক বা বাইপাস সড়ক নির্মাণের জন্য যোগাযোগ করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি ধসে যাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিনুর রহমান বলেন, আপাতত বাইপাস সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেই। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিবেচনায় রেখে মসজিদের সামনে কম্পন নিরোধক স্থাপন এবং ঢালাই সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই এই কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পণ্যবাহী ট্রাকের কম্পনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে ছোট সোনামসজিদ রক্ষা পাবে।
মন্তব্য করুন








