বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ইস্যুতে ক্রিকেট কূটনীতিতে অবনতি ভারতের অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্নে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান তাদের করা বিশ্লেষণে জানায়, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় বিষয়টি এখন কেবল ক্রিকেটের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই—বরং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতির বড় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের গ্রুপ ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পরই এই সিদ্ধান্ত আসে। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের এই বয়কটের ফলে বিশ্বকাপে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানও সংহতি প্রকাশ করে বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বিবেচনা করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।
আইসিসির দাবি, তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে; তবে ক্রীড়া মহলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিসিসিআইয়ের সঙ্গে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আইসিসির শীর্ষ পর্যায়ে ভারত–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য বিব্রতকর সময়ে সামনে আসছে বলে মনে করে ইংলিশ প্রভাবশালী পত্রিকা ‘গার্ডিয়ান’। গত মাসেই দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশটি এখন আহমেদাবাদকে কেন্দ্র করে ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের বিডে রয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় কাতারকে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আইওসি ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছে। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হতে হয় এবং অলিম্পিক মঞ্চে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতপ্রকাশও নিষিদ্ধ। একাধিক সূত্রের মতে, যদি কোনো দেশের আয়োজনে অন্য দেশগুলো বয়কটের ঝুঁকি থাকে, তাহলে সেই দেশকে অলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়াকে অলিম্পিক সংলাপ থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করার উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, আইওসি এ ধরনের ইস্যুতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে।
ক্রিকেট ১৯০০ সালের পর প্রথমবারের মতো আবার অলিম্পিকে ফিরছে—২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস ও ২০৩২ ব্রিসবেন গেমসে এই খেলাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় বাজারকে আকর্ষণ করতেই আইওসি ক্রিকেটকে অলিম্পিকে যুক্ত করেছে বলে ধারণা করা হলেও, রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলে তারা কোনো আপস করবে না—এমন বার্তাই স্পষ্ট।
এদিকে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের সিদ্ধান্তও ভারত–পাকিস্তান ক্রিকেট সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
আইওসি–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান জানায়, ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের যোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে চাইলে ভারতকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রীড়া সম্পর্ক উন্নয়নের স্পষ্ট অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ভারতের অলিম্পিক স্বপ্নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান
মন্তব্য করুন








