ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়লাভ করেছে বিএনপি। এর মাধ্যমে টানা দুই দশক পর আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মধ্য ডানপন্থি বিএনপি জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২ আসন পেয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭ আসন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাতের পর এটিই প্রথম নির্বাচন। সেসময় আন্দোলন দমন করতে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা করা হয়। দমন-পীড়নে নেতৃত্ব দেওয়া শেখ হাসিনা পালানোর পর বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। শুক্রবার সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণের ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞ’। নির্বাচনি প্রচারে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী হলে তারেক রহমান নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করবেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। ভোট গণনা নিয়ে ‘অসঙ্গতি ও কারচুপির’ অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেষ পর্যন্ত ফল মেনে নিয়েছে।
পরদিন রাজধানী ঢাকা ছিল শান্ত। বিএনপি বিজয় মিছিল না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে, মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়েও তেমন কোনো কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়নি। কয়েকজন সমর্থক ভোট গণনায় কারিগরি ত্রুটি ও গণমাধ্যমের পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই জামায়াত প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
যদিও বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন মিত্র ছিল। এবারের নির্বাচনে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়েছে। প্রচারণার সময় বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যও দেখা গেছে। তবে বিএনপি কর্মী সুজন মিয়া বলেন, ‘এখন শত্রুতা নয়, জাতি গঠনের সময়’।
গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে কর্মী কামাল হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘এতদিন মনে হতো শেখ হাসিনার শাসন কখনো শেষ হবে না।’ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণ এবার তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ ফিরিয়ে এনেছি। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, এই বিজয়ে দেশে ডানপন্থি উত্থান নিয়ে কিছু উদ্বেগ কমতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘আসল পরীক্ষা এখন শুরু। মানে সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা।’
তিনি আরও বলেন, এই লক্ষ্যগুলোকে ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে’ রাখা হয়েছিল।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বিএনপির বিজয় ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিবর্তনের রাজনীতিতে একটি ধাক্কা হতে পারে’।
তার মতে, ‘দলটি এখন জনগণ ও বিরোধীদের চাপের মুখে থাকবে, যাতে তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে না ফিরে যায়। যদি সরকার দমনমূলক বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে ফিরে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।’
তিনি জানান, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব থাকতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক সখ্যর কারণে হয়তো তারা জামায়াতের জয় প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু দেশটির সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কও দৃঢ়। একইভাবে চীনের সঙ্গেও বিএনপির যোগাযোগ আছে। এই বিশ্লেষকের মতে, ‘ভারত জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে’।
তবে ঢাকায় বিএনপির কার্যালয়ে মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে ভূরাজনীতি নয়, আনন্দই ছিল মুখ্য বিষয়। দলের নেতা শামসুদ দোহা নাতি-নাতনিদের নিয়ে উদ্যাপনে যোগ দেন। তার ভাষায়, ‘এই অনুভূতির সঙ্গে কিছুই মেলে না। দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরশাসনের দ্বারা কষ্ট পেয়েছি। এখন দেশ গড়ার সময়।’
বিএনপির আরেক সমর্থক রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘লোকজন আমাকে পাগল বলে। কারণ আমি বিএনপিকে আমার জীবনের সবকিছু মনে করি। আমরা জিতেছি। বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।’
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থতাজনিক কারণে মারা যান। তার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল। দুই দশক পর তার ছেলে তারেক রহমান আবার দলকে সরকারে ফিরিয়ে আনলেন।
মন্তব্য করুন








