যুক্তরাজ্য সরকারের অনুরোধে সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন প্রিন্স উইলিয়াম। রাজকীয় সূত্র বলছে, এই সফর নিয়ে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ হিসেবে দায়িত্বকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নেন, আর সরকার চাইলে তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেই প্রস্তুত থাকেন। খবর বিবিসির।
তবে এই সফরটি বেশ সংবেদনশীল। এস্তোনিয়া বা ব্রাজিলের মতো আগের সফরগুলোর চেয়ে সৌদি আরবের প্রেক্ষাপট অনেক বেশি জটিল। দেশটি একদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, অন্যদিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে।
সফরে সৌদি আরবের শক্তি রূপান্তর, তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। প্রিন্স উইলিয়াম এমন এক সৌদি আরব দেখছেন, যা তার দাদি রানি এলিজাবেথের সময়কার সৌদি আরবের চেয়ে অনেকটাই আলাদা, যদিও দেশটিতে এখনও কর্তৃত্ববাদী রাজতন্ত্র বিদ্যমান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে বড় বড় বিনোদন ও ক্রীড়া আয়োজন বেড়েছে। কমেডি ফেস্টিভ্যাল, চলচ্চিত্র উৎসব, ফর্মুলা ওয়ান রেস এবং ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে দেশটি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব আয়োজনের মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্ব নিজেদের মানবাধিকার রেকর্ড আড়াল করার চেষ্টা করছে।
এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে প্রিন্স উইলিয়ামের সাক্ষাৎ। যুবরাজ দেশটির কার্যত শাসক হলেও তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা রয়েছে, যদিও সৌদি আরব এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবে যেসব বিশ্বনেতা গেছেন, তা দেখলেই দেশটির আন্তর্জাতিক প্রভাব বোঝা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার সবাই সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেছেন।
এমনকি জো বাইডেনও ২০২২ সালের সমালোচনার মুখে জেদ্দায় গিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। অথচ একসময় সৌদি আরবকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ‘অসভ্য রাষ্ট্র’ বানানোর কথা বলেছিলেন বাইডেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে তিনি সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলতেই রাজি হননি। কিন্তু দেড় বছর পর নিজেই জেদ্দায় যুবরাজের প্রাসাদে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন।
সফরের আগে প্রিন্স উইলিয়ামকে সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশেষ করে নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমকামী সম্পর্ক অপরাধীকরণের মতো বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কূটনৈতিক সীমার মধ্যেই তিনি এসব সংবেদনশীল বিষয় আলোচনায় আনতে পারেন।
এই সফর এমন একসময়ে হচ্ছে, যখন ব্রিটিশ রাজপরিবার নিজেও নানা বিতর্কে চাপে রয়েছে। তবু যুক্তরাজ্য সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারকে কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। সে কারণেই প্রভাবশালী প্রতিনিধি হিসেবে প্রিন্স উইলিয়ামকে পাঠানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে আগ্রহী, আর প্রিন্স উইলিয়ামের উপস্থিতি তাদের কাছে সেই গুরুত্বের বার্তা দেয়। তবে মানবাধিকারকর্মীদের অনেকের কাছেই যুবরাজের সঙ্গে উইলিয়ামের ছবি দেখা অস্বস্তিকর হবে।
ব্রিটিশ রাজপরিবার দীর্ঘদিন ধরেই ‘নরম কূটনীতি’র মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশলে বিশ্বাসী। ধারণা করা হচ্ছে, এই সফরও সেই ধারাবাহিকতার অংশ যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার পথ তৈরি করা।
প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, এই সফর তাকে একজন বৈশ্বিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে গড়ে ওঠার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে। সফরে তার মূল দায়িত্ব হবে যুক্তরাজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সম্পর্ক আরও শক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ সুগম করা।
মন্তব্য করুন








