টানা তিন বছর ধরে চলা রাশিয়া ও ইউক্রেন সংঘাত বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যেই দুপক্ষের হাজার হাজার সেনাসহ বেসামরিক নিহত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এই সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট। এর মধ্যেই হতাশাজনক এক গবেষণা প্রতিবেদন সামনে এলো। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
২০২৫ সালে ইউক্রেনে বোমা হামলার ফলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্বব্যাপী সংঘাত পর্যবেক্ষণ গ্রুপ অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্স (এওএভি) জানিয়েছে। দেশটির শহর ও অবকাঠামো আস্তে আস্তে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
এওএভি জানিয়েছে, এ সময়ে ইউক্রেনে বোমা হামলায় ২ হাজার ২৪৮ জন বেসামরিক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৪৯৩ জন ২০২৫ সালে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ প্রতি হামলায় গড়ে ৪ দশমিক ৮ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নিহত বা আহতের খবর পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি।
গত বছরের ২৪ জুন সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়। রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন, অ্যাপার্টমেন্ট ও স্কুলগুলোতে আঘাত হানে। এতে করে ২১ জন নিহত হয়। আহত ৩১৪ জনের ৩৮ জনই শিশু।
এওএভির নির্বাহী পরিচালক ইয়ান ওভারটন বলেছেন, বর্তমান পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে ‘ইউক্রেনসহ একাধিক যুদ্ধে সংযম কমে যাচ্ছে’ এবং যুদ্ধে আনুপাতিকতা বা সীমা মানার যে নীতি আছে, ‘তা ভেঙে পড়ছে’।
সামরিক সুবিধা পেতে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষ বা অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা, সুদান, কঙ্গো ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতে এই নীতি লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ছে।
ওভারটন বলেন, ‘হোমস, আলেপ্পো, মারিউপোল থেকে গাজা; বছরের পর বছর আমরা এই ধ্বংস দেখছি। এখন পার্থক্য হলো, দায়ীদের জবাবদিহি করানোর মতো কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রায় নেই।’
২০২৫ সালে ইউক্রেনজুড়ে প্রায় প্রতি রাতেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। একই রকম আক্রমণ ২০২৬ সালের এখন অবধি চলছে। অব্যাহত হামলার ধরন দেখে বলাই যায়, যদি যুদ্ধবিরতি বা আপস না হয় তাহলে বছরের বাকি সময়টাও হামলা চলবে। এতে লাখো মানুষ বিদ্যুৎ, তাপ ও পানির সংকটে পড়েন। গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে ইউক্রেনে ৮০৫টি ড্রোন ও ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যা ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিমান হামলা।
এওএভি বিশ্বজুড়ে বিস্ফোরক সহিংসতায় বেসামরিক হতাহতের তথ্য ইংরেজি ভাষার সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংগ্রহ করে। তবে ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তারা জানায়।
২০২৪ সালের তুলনায় কমেছে বেসামরিক হতাহত
বিশ্বব্যাপী ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ২৬ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ ছিল অক্টোবরে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি। ২০২৫ সালে গাজায় এওএভি ১৪ হাজার ২৪ জন বেসামরিক হতাহতের তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম।
গত মাসে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, গাজার কর্তৃপক্ষ যে মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করেছে তা মোটামুটি সঠিক। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী নিহত ৭২ হাজার ৬১ জন এবং আহত ১ লাখ ৭১ হাজার ৭১৫ জন।
২০২৫ সালেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২৫ হাজার ৭১৮ জন নিহত ও ৬২ হাজার ৮৫৪ জন আহতের তথ্য দিয়েছে। কেবল ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকৃত সংখ্যা পুরোপুরি উঠে আসছে না।
এওএভির হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে ৪৫ হাজার ৩৫৮ জন বেসামরিক হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিহত ১৭ হাজার ৫৮৯ জন এবং আহত ২৭ হাজার ৭৬৯ জন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ৩৫৩।
বিস্ফোরক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ইসরায়েলের সঙ্গে জড়িত সংঘাতে, যা সামান্য ব্যবধানে রাশিয়ার চেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে মোট হতাহতের ৩৫ শতাংশ ইসরায়েল-সম্পর্কিত এবং ৩২ শতাংশ রাশিয়া-সম্পর্কিত সংঘাতে হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সুদান (৫ হাজার ৪৩৮) ও মিয়ানমারে (৩ হাজার ১৭৮)।
মন্তব্য করুন








