তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও গভীর হতে যাচ্ছে। কায়রো সফর শেষে ফেরার পথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান জানান, আঙ্কারার নিজস্বভাবে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ রিয়াদের আগ্রহ কেড়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে ইতোমধ্যে ‘বড়’ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তুরস্ক ও সৌদি আরবের কৌশলগত সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আনাদোলুকে এরদোয়ান বলেন, ‘কান নিয়ে আমরা অনেক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। এই ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে এবং যেকোনো সময় এই অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।’
তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, আঙ্কারা ও রিয়াদ ইতোমধ্যে ‘বড়’ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণে তুরস্ক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়; এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনও জড়িত। এই সম্পর্ক আরও গভীর করতে সাম্প্রতিক সফরে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে এরদোয়ান বলেন, ‘এই খাতে আমাদের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা সৌদি আরবসহ সারা বিশ্ব গভীর আগ্রহের সঙ্গে অনুসরণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, তুরস্ক প্রথমে নিজেদের প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণে গুরুত্ব দিলেও বন্ধু ও মিত্র দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতেও প্রস্তুত।
স্থানীয়ভাবে উন্নত যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কান কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়; এটি তুরস্কের প্রকৌশল সক্ষমতা এবং স্বাধীন প্রতিরক্ষা ভাবনার প্রতীক।’ বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
প্রথমে সৌদি আরব ও পরে তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র মিশরে দুই দিনের সফর শেষে এসব মন্তব্য করেন এরদোয়ান। কায়রো সফরকালে দুই দেশ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মধ্যে একটি সামরিক কাঠামো চুক্তিও রয়েছে। সফরের সময় এরদোয়ান মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল-ফাত্তাহ আল-সিসিকে তুরস্কের নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি ‘টগ’ উপহার দেন।
রিয়াদের সঙ্গে বিস্তৃত সহযোগিতা
সৌদি আরবে উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল রূপান্তরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং তুরস্কের ‘তুরস্কের শতাব্দী’ উদ্যোগের আওতায় সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগিয়ে তেলবহির্ভূত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব জোরদার করাই দুই দেশের লক্ষ্য।
এ ছাড়া তুরস্কে দুটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের একটি জ্বালানি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি কোম্পানিগুলো প্রথম পর্যায়ে সিভাস ও কারামান প্রদেশে ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে।
‘কান’ যুদ্ধবিমানটি টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) নির্মিত পঞ্চম প্রজন্মের একটি ফাইটার জেট। ২০২৩ সালে এটি প্রথমবার জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয় এবং ২০২৪ সালের শুরুতে এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়। জেটটির ধারাবাহিক উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু হওয়ার কথা।
গত জুনে টিএআই ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ৪৮টি কান যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে দেশটি এই উন্নত যুদ্ধবিমানের প্রথম ক্রেতা হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তুরস্ক আকাশ ও নৌ প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্পকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ইতোমধ্যেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আঞ্চলিক সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তুরস্ক ও সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে মধ্যপ্রাচ্যের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সূত্র: আনাদোলু, সাবা
মন্তব্য করুন








