ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক আলোচনার সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরিটি বর্তমানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে অনিশ্চিত আলোচনায় ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ এই অঞ্চলে সংঘাতের সম্ভাবনা ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি করছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানায়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে একটি বিমানবাহী রণতরি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ওই অঞ্চলে দুটি মার্কিন রণতরি অবস্থান করবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বর্তমানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এটি ভেনেজুয়েলায় এক অভিযানে অংশ নিয়েছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে জাহাজটির অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে মোট ১১টি বিমানবাহী রণতরি রয়েছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ, তাই সাধারণত অনেক আগেই তাদের মোতায়েনের সময়সূচি ঠিক করা থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড যোগ দেবে আরেক মার্কিন রণতরি ইউএসএ আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে। সেখানে ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান ও নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন। তবে সেখানে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো ‘মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের জন্য দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি প্রস্তুত করছে পেন্টাগন।’
এ ছাড়াও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ও এর এসকর্ট জাহাজ ক্যারিবিয়ান থেকে মোতায়েন করা হবে। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, আগামী মাসের মধ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি চুক্তি করতেই হবে, না হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়ানক হবে।’
গত সপ্তাহে ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের পর এটি ছিল দুই শত্রু রাষ্ট্রের প্রথম দফার পরোক্ষ আলোচনা। তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষই বলছে, তারা কূটনৈতিক পথ অব্যাহত রাখবে। তবে কবে দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী আলোচনা হবে, সে ব্যাপারে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেন চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত না করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে তেহরান।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ফোর্ড
২০২৫ সালের জুন থেকে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড সমুদ্রে অবস্থান করছে। গত নভেম্বরে ইউরোপে যাওযার কথা থাকলেও হঠাৎ করে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়।
সাধারণত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন রাখার সময় প্রায় নয় মাস। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়লে সেই সময় বাড়ানো হয়। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, টানা সমুদ্রে অবস্থান নাবিকদের মনোবল ও জাহাজের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলত পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসন আরও একটি রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর কথা ভাবছে। তবে সেটি এখনো প্রস্তুত নয়, মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্নে পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছাতে এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে।
জেরাল্ড আর. ফোর্ডের সামরিক সক্ষমতা
পারমাণবিকচালিত জেরাল্ড আর. ফোর্ডে ৭৫টির বেশি যুদ্ধবিমান বহন করা যায়। এর মধ্যে আছে এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান ও আকাশ থেকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন নর্থরপ গ্রুমম্যান ই-২ হকআই। এ ছাড়াও জাহাজটিতে অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নেভিগেশনে সহায়তা করে।
জেরাল্ড আর. ফোর্ডের বহরে রয়েছে গাইডেড মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস নরম্যান্ডি এবং আর্লে বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস থমাস থান্ডার, ইউএসএস রামেজ, ইউএসএস কার্নি ও ইউএসএস রুজভেল্ট। এসব জাহাজের ভূমি থেকে আকাশে, ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানা এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
মন্তব্য করুন








