ইরানে সাম্প্রতিক ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে পাঁচ হাজারের অধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। মৃত্যু দণ্ডাদেশের মুখোমুখি হয় গ্রেপ্তার হওয়া ৮০০ বিক্ষোভকারী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার এই পদক্ষেপ থেকে সরে আসে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘোষণা দেন যে, তাকে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিধায় তিনিও দেশটিতে ‘সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি আপাতত ভাবছেন না’।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেশে আপাতত মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এড়ানো গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। যার পেছনে উপসাগরীয় দেশগুলো ও তুরস্কের সক্রিয় তৎপরতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আশ্চর্যজনকভাবে দখলদার ইসরায়েল নিজেও সম্ভাব্য এই সংঘাত চায়নি। এসব ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায়, আপাতত ইরান ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতি অথবা তার চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি থেকে রেহাই পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও হতে পারে। উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানের নেতৃত্বকে আশ্বস্ত করা, যেন তারা সতর্কতা কিছুটা কমিয়ে দেয়। পরে সুযোগ পেলে ইরানের ওপর বাস্তব হামলা চালানো সহজ হবে। আরেকটা সম্ভাবনাও আছে, ট্রাম্প হয়তো সত্যিই অন্তত কিছু সময়ের জন্য সেই পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে রাজি হয়েছেন।
তবে টার্গেট করে হত্যা বা বোমা হামলার মতো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না থাকলেও, বিশেষ করে ইরানি সরকারের জন্য এটি ধরে নেওয়া নিরাপদ হবে যে, এসব হস্তক্ষেপ কেবল স্থগিত রাখা হয়েছে, এর বেশি কিছু নয়।
তবে এই আমূল সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ভার্জিনিয়া ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. অ্যালাইন গ্যাবন। তার মতে, ট্রাম্পের আঞ্চলিক মিত্রদের কঠোর বিরোধিতা, ইরাক বিপর্যয়ের টাটকা উদাহরণ, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, গোটা অঞ্চলে বিশেষ করে লেবাননে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, তথাকথিত ‘মিশন ক্রিপ’ বা সামরিক অভিযান অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, ইরানের ভেতরে চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যোগ্য কোনো বিরোধী নেতৃত্বের অভাব।
সর্বশেষ বিষয়টিতে বলা যায়, ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভিকে ট্রাম্প না সম্মান করেন, না বিশ্বাস করেন। অবশ্য পাহলভি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বিক্ষোভ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করেছিলেন। তিনি যতটা না খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন, তার চেয়ে বরং সরকারবিরোধীদের বিভক্তই করেছেন বেশি। ব্যাপক বিক্ষোভে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করা হলে ইরান সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পায়, ঠিক সেসময়ও আন্দোলনকারীরা রেজা পাহলভিকে পাশে পায়নি। এতে করে আস্থা সংকটে পড়েছেন তিনি। এর আরেক কারণ হলো শত্রুদেশ ইসরায়েল পাহলভির হয়ে প্রচারণা চালালে বিক্ষোভকারীদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে।
এছাড়াও ইরানে ট্রাম্পের হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে তেলের দামের সম্ভাব্য বৃদ্ধি, যা চলতি বছরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নিজস্ব ভোটারদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত। এই ইস্যুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলেই তীব্র বিভাজন দেখা দিয়েছে। এছাড়া, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের বিপুল সংখ্যক সদস্য ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ না করার পেছনে এসব কারণ থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে যে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে বোমা ফেলবে না, তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াই হাউসে ফেরার বছরের মাথায় নিজেকে ‘বেপরোয়া’ হিসেবে বিশ্বের সামনে জাহির করেছেন ট্রাম্প। ফলে যেকোনো সময় যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে অনেকেই মনে করেন। অবশ্য তার এই ‘মাথা গরম’ আচরণ অন্যান্য দেশগুলোকে ‘ভীত রাখা’র কৌশল। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে এর পেছনের চালিকাশক্তি হিসেবে মনে করা হয়।
মন্তব্য করুন








