রসুন শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, এটি আমাদের শরীরের জন্যও নানাভাবে উপকারী। গবেষণা দেখিয়েছে যে, রসুন নিয়মিত খেলে সাধারণ সর্দি-কাশি প্রতিরোধে সাহায্য হতে পারে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে এবং কোলেস্টেরল কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য রসুন ব্যবহার করত। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস। যাকে প্রায়ই পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি বলেছেন, খাদ্য হোক তোমার ওষুধ এবং ওষুধ হোক তোমার খাদ্য (Let food be thy medicine, and medicine be thy food.)। তিনি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য রসুন ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানও অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করেছে।
রসুনে আছে শক্তিশালী ঔষধি উপাদান
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ রসুনকে এর ঔষধি ও স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য ব্যবহার করেছে। রসুন কেটে, চূর্ণ করে বা চাবানোর পর সালফারযুক্ত যৌগ তৈরি হয়, যা এর স্বাস্থ্য উপকারিতার মূল কারণ। সবচেয়ে পরিচিত যৌগ হলো অ্যালিসিন। তবে অ্যালিসিন অস্থায়ী এবং কেটে বা চূর্ণ করার পর কিছুক্ষণের জন্যই থাকে।
অন্যান্য যৌগ যেমন ডায়ালিল ডাইসালফাইড এবং এস-অ্যালিল সিস্টেইনও রসুনের স্বাস্থ্য উপকারিতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
রসুন পুষ্টিকর কিন্তু কম ক্যালরি সম্পন্ন
প্রতি ক্যালরিতে রসুন অত্যন্ত পুষ্টিকর। একটি রসুনের কোয়া (প্রায় ৩ গ্রাম) মাত্র ৪.৫ ক্যালরি, ০.২ গ্রাম প্রোটিন এবং ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট দেয়।
রসুনে আছে ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, সেলেনিয়াম ও ফাইবার। এছাড়াও এতে অল্প পরিমাণে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকে।
রসুন অসুস্থতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে
২০১৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, এজড রসুন নির্যাস (AGE) আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
গবেষণার সময় যারা ঠাণ্ডা ও ফ্লুর মরসুমে তিন মাস AGE সাপ্লিমেন্ট নিয়েছিলেন, তারা কম সময় অসুস্থ ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, রসুনের যৌগে ভাইরাস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
অর্থাৎ, রসুন বা রসুন সাপ্লিমেন্ট সর্দি-ফ্লু এবং অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতা প্রতিরোধ ও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে রসুন
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের অন্যতম কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, রসুন সাপ্লিমেন্ট উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের রক্তচাপ কমাতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব কিছু প্রেসার নিয়ন্ত্রণ ওষুধের মতোই, কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম।
উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা রসুন সাপ্লিমেন্ট নিয়েও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পেতে পারেন।
রসুন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
গবেষণা দেখায় যে, রসুন মোট কোলেস্টেরল ও LDL (খারাপ কোলেস্টেরল) কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে HDL (ভালো কোলেস্টেরল) বা ট্রাইগ্লিসারাইডের ওপর এর কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি।
রসুন বিশেষ করে যারা সামান্য উচ্চ কোলেস্টেরল সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য উপকারী হতে পারে।
আলঝেইমারসহ জ্ঞানশক্তি ক্ষয় কমাতে সাহায্য করতে পারে
ফ্রি রেডিক্যালস থেকে সৃষ্ট অক্সিডেটিভ ক্ষয় বার্ধক্য ও মস্তিষ্কের জ্ঞানশক্তি হ্রাসে ভূমিকা রাখে। রসুনের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এই ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণা নির্দেশ করে যে, এটি আলঝেইমারসহ অন্যান্য ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।
রসুন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা ও বার্ধক্যজনিত ক্ষয় ধীর করতে সাহায্য করতে পারে।
রসুন জীবনকাল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে
যদিও মানবদেহে এটি প্রমাণ করা কঠিন, রসুনের রক্তচাপ ও সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতার সুবিধার কারণে দীর্ঘজীবন সম্ভাবনা আছে।
অর্থাৎ, রসুন দীর্ঘজীবন ও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
রসুন শারীরিক কর্মক্ষমতা উন্নত করতে পারে
প্রাচীনকাল থেকে শ্রমিকদের ক্লান্তি কমাতে ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে রসুন ব্যবহার করা হতো। বর্তমান মানুষের ওপর গবেষণা সীমিত। কিছু প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (oxidative stress হলো শরীরের ফ্রি র্যাডিক্যাল এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। এর ফলে কোষের ক্ষতি হয় এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসুখের ঝুঁকি বাড়ে।) কমাতে সাহায্য করে।
রসুন শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে খেয়াল রাখবেন মানবদেহে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
রসুন শরীর থেকে ভারী ধাতু নির্গমন করতে সাহায্য করতে পারে
উচ্চ মাত্রায় রসুনের সালফার যৌগ রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ধাতু বিষক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে। রসুন লেড ও অন্যান্য ভারী ধাতুর ক্ষতি কমাতে সক্ষম।
রসুন হাড়ের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে
গবেষণা দেখায় যে, বিশেষ করে মেনোপজ পরবর্তী মহিলাদের জন্য, রসুন oxidative stress কমাতে সাহায্য করে যা অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সহায়ক।
সংক্ষেপে, হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় রসুন কিছুটা উপকার দিতে পারে।
রসুন ব্যবহার সহজ এবং খাবারে স্বাদ যোগ করে
রসুন সহজেই আপনার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এটি স্যুভি খাবার, স্যুপ, সস এবং ড্রেসিংয়ে ব্যবহার করা যায়।
অর্থাৎ, রসুন সুস্বাদু এবং সহজে ব্যবহৃত হয়।
রসুনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- মুখের দুর্গন্ধ
- কিছু মানুষের জন্য অ্যালার্জি
- রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা থাকলে সাবধান
- রক্ত পাতলা করার ঔষধ নিলে রসুন বেশি না খাওয়াই ভালো
হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মানুষ রসুনকে ঔষধি গুণের জন্য বিশ্বাস করে আসছে। আধুনিক গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে এটিকে নিশ্চিত করছে।
রসুন বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর। তবে যদি আপনি রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করেন, রসুন বেশি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: হেল্থ লাইন
মন্তব্য করুন








