ক্যানসারের চিকিৎসা সাধারণত ওষুধের ধরন, রোগের স্তর ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ঠিক করা হয়। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, চিকিৎসা নেওয়ার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এক্ষেত্রে। বিশেষ করে ইমিউনোথেরাপির ক্ষেত্রে দিনের কোন সময়ে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, তা ফলাফলের ওপর বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি গবেষকরা ফুসফুসের একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত ২১০ জন রোগীর ওপর একটি পরীক্ষা চালান। সবাই একই ধরনের ইমিউনোথেরাপি পান। পার্থক্য ছিল শুধু সময়ের। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী একদল রোগী বিকেল ৩টার আগে চিকিৎসা নেন, আরেক দল বিকেল ৩টার পরে।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। যারা সকালে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের ক্যানসার গড়ে প্রায় পাঁচ মাস বেশি সময় নিয়ন্ত্রণে ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘প্রগ্রেশন ফ্রি সারভাইভাল’ (প্রগ্রেশন ফ্রি সারভাইভাল বা পিএফএস বলতে বোঝায় চিকিৎসা চলাকালীন এবং চিকিৎসার পর এমন একটি সময়কাল, যখন রোগী ক্যানসারের মতো কোনো রোগ নিয়ে বেঁচে থাকেন কিন্তু রোগটি আর বাড়ে না বা খারাপের দিকে যায় না।) শুধু তাই নয়, তারা গড়ে প্রায় এক বছর বেশি বেঁচে ছিলেন। গবেষণা শেষে দেখা যায়, সকালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের প্রায় ৪৫ শতাংশ তখনও জীবিত ছিলেন, যেখানে বিকেলে চিকিৎসা নেওয়া দলে এ হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।
গবেষকেরা বহুদিন ধরেই শরীরের জৈব ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ে কাজ করছেন। এই জৈব ঘড়ি আমাদের হরমোন নিঃসরণ, ক্ষুধা, ঘুম, শরীরের তাপমাত্রা, রক্তে শর্করার মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সময়ের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সকালে টি সেল নামের বিশেষ শ্বেত রক্তকণিকা বেশি সক্রিয় থাকে। এই কোষগুলো ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। ক্যানসার কোষ সাধারণত এই টি সেলকে দুর্বল করে দেয়। ইমিউনোথেরাপির ওষুধ সেই বাধা দূর করে টি সেলকে সক্রিয় রাখে। ফলে যদি সকালে শরীরে বেশি সক্রিয় টি সেল উপস্থিত থাকে, তাহলে ওষুধের প্রভাবও বেশি হতে পারে।
তবে সব বিশেষজ্ঞই এখনও সতর্ক অবস্থানে আছেন। কারণ, ইমিউনোথেরাপির ওষুধ শরীরে কয়েক সপ্তাহ সক্রিয় থাকে। তাহলে শুধু প্রথম ডোজের সময় এত বড় পার্থক্য কেন হবে, সে প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি আরও বড় পরিসরে ও ভিন্ন দেশে পুনরায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সময়ভিত্তিক পরিবর্তন আনা সহজ নয়। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সময়সূচি পুনর্গঠন করতে হবে। তাই নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
তবে এই গবেষণা নতুন এক দিক উন্মোচন করেছে। আগে কিছু পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় মেলানোমা ও কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। নতুন গবেষণাটি প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় শুধু কোন ওষুধ দেওয়া হচ্ছে তা নয়, কখন দেওয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সার্কাডিয়ান মেডিসিন বা সময়ভিত্তিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে।
ক্যানসারের চিকিৎসায় সময়ের ভূমিকা থাকতে পারে, এমন ধারণা এখন আর কল্পনা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিষয়। যদিও আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবু প্রাথমিক ফলাফল বলছে, দিনের সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ফল আরও ভালো হতে পারে। ভবিষ্যতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনায় রোগীর জৈব ঘড়িকেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। এতে ক্যানসার চিকিৎসা আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
মন্তব্য করুন








