আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো কিডনি। পেটের দুই পাশে থাকা এই ছোট অঙ্গ প্রতিদিন নীরবে শরীরের জন্য বিশাল কাজ করে যায়। রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে মূত্র তৈরি করা, শরীরের লবণ ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনে ভূমিকা রাখা; সবই কিডনির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা না বুঝেই এমন কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস গড়ে তুলি, যা ধীরে ধীরে কিডনির ক্ষতি করে। সমস্যা হলো, কিডনির রোগ অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ দেখায় না। ফলে যখন ধরা পড়ে, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে। তাই আগে থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
ভারতের রুবি হল ক্লিনিকের ইউরোলজিস্ট ডা. ক্ষিতিজ রঘুবংশী জানিয়েছেন, আমাদের তিনটি সাধারণ অভ্যাস কিডনির ওপর নীরব ক্ষতি ডেকে আনছে। বিষয়গুলো জেনে রাখা প্রয়োজন।
নিয়মিত পেইনকিলার খাওয়া
মাথাব্যথা, কোমর বা শরীর ব্যথা, কিংবা মাসিকের সময়ের অস্বস্তিতে অনেকেই ইবুপ্রোফেন বা ন্যাপ্রোক্সেনের মতো ওষুধ খেয়ে থাকেন। এই ধরনের ওষুধকে বলা হয় নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস, সংক্ষেপে (এনএসএআইডিএস)।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা দীর্ঘদিন নিয়মিত এসব ওষুধ সেবন কিডনির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এনএসএআইডিএস কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে কিডনির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। যাদের আগে থেকেই কিডনি সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত পেইনকিলার খেলে কিডনিতে প্রদাহ তৈরি হতে পারে, যা পরে স্থায়ী কিডনি বিকলের কারণ হতে পারে। একইসঙ্গে একাধিক ব্যথানাশক একসঙ্গে খাওয়া বা নির্ধারিত মাত্রার বেশি গ্রহণ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা আরও বাড়ে।
অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস
অনেকে মনে করেন, সাধারণ লবণের বদলে সি সল্ট বা হিমালয়ান লবণ ব্যবহার করলে তা স্বাস্থ্যকর। কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের লবণেই মূল উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড। তাই অতিরিক্ত পরিমাণে যেকোনো লবণই ক্ষতিকর।
শরীরে বেশি সোডিয়াম গেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। কিডনিকে তখন অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, যা ধীরে ধীরে তার কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণের ধরন বদলানোর চেয়ে প্রতিদিনের মোট লবণ গ্রহণ কমানোই বেশি জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশে অনেকেই অজান্তেই এর চেয়ে বেশি লবণ খেয়ে ফেলেন, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস, আচার, ফাস্টফুড বা ভর্তা জাতীয় খাবারের মাধ্যমে।
প্রয়োজনের বেশি পানি খাওয়া
পানি শরীরের জন্য অপরিহার্য। তবে অনেকেই মনে করেন, যত বেশি পানি খাবেন তত ভালো। এই ধারণা সবসময় সঠিক নয়।
দিনে ৬ থেকে ৭ লিটার পানি খাওয়া অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রয়োজন নেই। বরং অতিরিক্ত পানি খেলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে, যাকে বলা হয় হাইপোনাট্রিমিয়া। এতে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, খিঁচুনি এমনকি গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে ২ থেকে ৩ লিটার তরল গ্রহণ যথেষ্ট। তবে গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, গর্ভাবস্থা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন বাড়তে পারে। তাই জোর করে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি না খেয়ে শরীরের তেষ্টা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পানি পান করাই ভালো।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না
- কিডনি, লিভার, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ থাকলে বিশেষ সতর্ক থাকুন
- নির্ধারিত মাত্রার বেশি কখনোই ওষুধ গ্রহণ করবেন না
- হারবাল বা আয়ুর্বেদিক বলে পরিচিত ওষুধও সবসময় নিরাপদ নয়, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে
- ওষুধের লেবেল ভালোভাবে পড়ে নিন। কারণ, অনেক ওষুধে একাধিক উপাদান থাকে এবং অজান্তেই অতিরিক্ত মাত্রা হয়ে যেতে পারে
কিডনি আমাদের শরীরের নীরব কর্মী। এটি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনেক সময় তার গুরুত্ব বুঝতে পারি না। কিন্তু দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসই ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। অযথা ওষুধ সেবন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং প্রয়োজনের বেশি পানি পান- এই তিনটি অভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনলেই কিডনিকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব।
সুস্থ থাকতে হলে কিডনির যত্ন নেওয়া এখনই শুরু করা উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং সচেতন জীবনযাপনই হতে পারে কিডনি সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র : দ্য ওয়াল
মন্তব্য করুন








