জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আমরা সবাই মাথাব্যথার সমস্যায় পড়েছি। মাথাব্যথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। এটি মাথায় ব্যথা, চাপ, টান বা ভারী অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ পায় সাধারণত।
মাথাব্যথার ধরন অনেক রকম হতে পারে এবং এর লক্ষণ, তীব্রতা ও চিকিৎসাও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে প্রশ্ন হলো, আপনার মাথাব্যথা কি সাময়িক কোনো সমস্যা, নাকি এটি কোনো গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে? খবর ডিগনিটি হেল্থ
চলুন মাথাব্যথার ৭টি সাধারণ ধরন জেনে নিই।
চিন্তাজনিত মাথাব্যথা বা টেনশন হেডেক সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা থেকে হয়ে থাকে। এই ব্যথা সাধারণত মাথাজুড়ে হালকা থেকে মাঝারি চাপ বা যন্ত্রণার মতো অনুভূত হয়। অনেক সময় ঘাড়, কপাল বা কাঁধের পেশিতে ব্যথা বা শক্তভাবও থাকতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধেই এই মাথাব্যথা কমে যায়।
সাইনাসে সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে সাইনাস জনিত মাথাব্যথা বা সাইনাস হেডেক হতে পারে। এতে গাল, কপাল বা নাকের চারপাশে গভীর ও স্থায়ী ব্যথা অনুভূত হয়। হঠাৎ মাথা নড়াচড়া করলে ব্যথা বাড়তে পারে। এর সঙ্গে নাক দিয়ে পানি পড়া, জ্বর বা মুখে ফোলাভাবও থাকতে পারে।
এই ধরনের মাথাব্যথায় সাইনাসের ভেতরের জমে থাকা কফ পাতলা করার চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিকনজেস্ট্যান্ট, অ্যান্টিহিস্টামিন বা নাকের স্প্রে ব্যবহার করা হয়। সাইনাসে সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে।
অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের পর অধিক শারীরিক পরিশ্রম জনিত মাথাব্যথা বা এক্সারশন হেডেক দেখা দিতে পারে। দৌড়ানো, ভার উত্তোলন বা যৌন ক্রিয়ার পর এমন ব্যথা হতে পারে। সাধারণত মাথার দুই পাশে ধকধকে ব্যথা হয় এবং এটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। সাধারণ ব্যথানাশক ও বিশ্রাম নিলে উপশম পাওয়া যায়।
মাইগ্রেন একটি জটিল ও তীব্র মাথাব্যথা, যা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করতে পারে। এটি অনেক সময় পরিবেশ পরিবর্তন, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি বা আবহাওয়ার কারণে শুরু হয়। ব্যথা ৩০ মিনিট থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
মাইগ্রেনে সাধারণত মাথার এক বা দুই পাশে তীব্র ধকধকে ব্যথা হয়। এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, বমি, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং আলো, শব্দ বা গন্ধে অস্বস্তি হতে পারে। অনেক সময় চোখের সামনে ঝাপসা দেখা বা আলো ঝলকানোর মতো লক্ষণও দেখা দেয়।
হালকা মাইগ্রেনে সাধারণ ব্যথানাশক কাজ করলেও, দীর্ঘদিনের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।
নারীদের মধ্যে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাথাব্যথা খুবই সাধারণ। মাসিক, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কারণে ইস্ট্রোজেনের ওঠানামা হলে মাথাব্যথা হতে পারে। অনেক নারী মাসিকের সময় মাইগ্রেনের মতো তীব্র ব্যথায় ভোগেন।
এই ধরনের মাথাব্যথায় ব্যথানাশক ওষুধের পাশাপাশি যোগব্যায়াম, বিশ্রাম, মানসিক চাপ কমানো এবং খাবারের ধরন পরিবর্তন উপকারী হতে পারে।
ক্লাস্টার হেডেক তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সাধারণত চোখের চারপাশে বা চোখের পেছনে তীব্র জ্বালাপোড়া বা সূচ ফোটানোর মতো ব্যথা হয়। একই পাশে চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হওয়া, মুখ লাল হয়ে যাওয়া বা চোখের পাতা ঝুলে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
এই ব্যথা দিনে একাধিকবার হতে পারে এবং কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। এটি নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অক্সিজেন থেরাপি ও নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করে এই ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
রক্তচাপ খুব বেশি বেড়ে গেলে এই ধরনের মাথাব্যথা হতে পারে। সাধারণত মাথার দুই পাশে ধকধকে ব্যথা হয়। এর সঙ্গে চোখে ঝাপসা দেখা, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ থাকতে পারে।
এই অবস্থায় দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনলেই সাধারণত মাথাব্যথা কমে যায়।
মাথাব্যথা খুবই সাধারণ সমস্যা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক। একদিনের মধ্যে অনেক মাথাব্যথা নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যদি মাথাব্যথা দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয়, ক্রমেই তীব্র হয় বা নিয়মিত হতে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিজের শরীরের লক্ষণগুলো বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে মাথাব্যথার জটিলতা এড়ানো সম্ভব। নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মাথাব্যথা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মন্তব্য করুন








