বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাড়ি, অফিস, পড়াশোনা থেকে বিনোদন—সবখানেই ওয়াইফাই ব্যবহার হচ্ছে নিয়মিত। তবে অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সারাক্ষণ চালু থাকা ওয়াইফাই সিগন্যাল আমাদের ঘুম, স্বাস্থ্য, এমনকি ঘরের গাছপালার ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের কিছু গবেষণা ও ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, রাতে ঘুমানোর সময় ওয়াইফাই বন্ধ রাখলে কিছু সম্ভাব্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
ঘুমের মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
ভালো ঘুম সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম না হলে শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, মনোযোগ কমে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের সংস্পর্শে থাকলে ঘুমের গভীর স্তর কমে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার RMIT University-এর একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাউটারের কাছাকাছি ঘুমানো কিছু মানুষের মধ্যে অনিদ্রার অভিযোগ বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২.৪ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল গভীর ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া, ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন মেলাটোনিন উৎপাদনের সঙ্গেও তড়িৎচৌম্বক সিগন্যালের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। রাতে ওয়াইফাই বন্ধ রাখলে শরীর স্বাভাবিকভাবে বিশ্রামে যেতে পারে, ফলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। ভালো ঘুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
ওয়াইফাই, মোবাইল ফোন ও ব্লুটুথ ডিভাইস থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র নির্গত হয়। World Health Organization পূর্বে এই ধরনের বিকিরণকে সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে International Agency for Research on Cancer আরও পর্যালোচনার সুপারিশ করে। যদিও অধিকাংশ গবেষণা মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীভূত, তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সার্বিক বিকিরণ কমানোই নিরাপদ পন্থা।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং যারা তড়িৎচৌম্বক সংবেদনশীলতায় ভুগছেন বলে মনে করেন, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। কিছু মানুষের মধ্যে মাথাব্যথা, অবসাদ, মনোযোগের ঘাটতি, চোখে চাপ বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও মূলধারার সংস্থাগুলো বলছে ওয়াইফাই বিকিরণ খুবই নিম্নমাত্রার, তবুও অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ কমানো ক্ষতিকর নয়।
পুরুষ প্রজননস্বাস্থ্য ও কোষগত প্রভাব
কিছু গবেষণায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সঙ্গে শুক্রাণুর গতি ও গুণগত মানের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় শরীরের খুব কাছে ডিভাইস রাখা হলে তাপ ও বিকিরণের সম্মিলিত প্রভাবে কোষীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এ ছাড়া, যেকোনো ধরনের বিকিরণ কোষের স্বাভাবিক সংকেত আদান–প্রদানে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। যদিও ওয়াইফাই অ-আয়নকারী বিকিরণ, যা এক্স–রের মতো উচ্চশক্তির নয়, তবুও সারাদিন বিভিন্ন উৎস থেকে বিকিরণ যুক্ত হলে মোট সংস্পর্শের পরিমাণ বেড়ে যায়। রাতে ওয়াইফাই বন্ধ রাখলে এই মোট সংস্পর্শ কিছুটা কমানো সম্ভব।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশগত লাভ
ওয়াইফাই রাউটার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলে অল্প হলেও বিদ্যুৎ খরচ হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় এবং কার্বন নিঃসরণেও ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় এবং রাউটারের আয়ু বাড়তে পারে।
এ ছাড়া, রাতে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহারও কমে, যা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
গাছপালার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
কিছু পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের সংস্পর্শে থাকলে কিছু সংবেদনশীল উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম, পাতা বৃদ্ধি ও পুষ্টি শোষণে প্রভাব পড়তে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবুও অনেকে মনে করেন রাতে ওয়াইফাই বন্ধ রাখলে ঘরের গাছপালা তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশ পায়।
রাতে যেভাবে ওয়াইফাই বন্ধ রাখবেন
ম্যানুয়াল পদ্ধতি: ঘুমাতে যাওয়ার আগে রাউটারের সুইচ বন্ধ করে দেওয়া বা বিদ্যুৎ সংযোগ খুলে রাখা যায়। সকালে আবার চালু করতে হবে।
টাইমার বা স্মার্ট প্লাগ ব্যবহার: টাইমার প্লাগ বা স্মার্ট প্লাগ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ে রাউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ ও চালু করা যায়। অনেক রাউটারেই নির্দিষ্ট সময়সূচি সেট করার সুবিধা থাকে।
রাউটারের অবস্থান পরিবর্তন: যদি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হয়, তবে রাউটার শোবার ঘর থেকে দূরে রাখা যেতে পারে, যেমন বসার ঘর বা করিডরে।
রাতে ওয়াইফাই বন্ধ রাখা একটি ছোট কিন্তু সচেতন পদক্ষেপ। এটি ঘুমের মান উন্নত করতে, সম্ভাব্য তড়িৎচৌম্বক সংস্পর্শ কমাতে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে এবং ঘরের পরিবেশকে আরও স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়তা করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সব গবেষণার ফল একমত নয়, তবুও অপ্রয়োজনীয় এক্সপোজার কমানো একটি নিরাপদ অভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পরিবারের সবার সুস্থতা, ভালো ঘুম এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের জন্য রাতে কয়েক ঘণ্টা ওয়াইফাই বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
সূত্র: ইএমএফ এমপাওয়ারমেন্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া