আমাদের শরীর শক্তির জন্য খাবারের ওপর নির্ভরশীল। তাই কয়েক ঘণ্টা না খেলে ক্ষুধা লাগা স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত খাবার খাওয়ার পরও যদি পেটে সব সময় ক্ষুধা লাগে, তাহলে এর পেছনে শারীরিক কোনো কারণ থাকতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত ক্ষুধাকে বলা হয় পলিফেজিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে এমন সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিচে সব সময় ক্ষুধা লাগার কয়েকটি সাধারণ কারণ তুলে ধরা হলো।
আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে তৈরি হয় গ্লুকোজ, যা শরীরের জ্বালানি। কিন্তু ডায়াবেটিস হলে এই গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে পারে না। ফলে শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে গ্লুকোজ বের করে দেয় এবং আবার খাবার খেতে সংকেত দেয়।
বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক বেশি খেয়েও ওজন কমতে দেখেন।
ডায়াবেটিসের অন্যান্য লক্ষণ
- অতিরিক্ত পিপাসা
- বারবার প্রস্রাব
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- ঝাপসা দেখা
- কাটা বা আঘাত দেরিতে সারা
- হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা ব্যথা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলো যখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা খুব কমে যায়। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে অন্য সমস্যাতেও হতে পারে। যেমন লিভারের প্রদাহ, কিডনি রোগ, অগ্ন্যাশয়ের কিছু টিউমার বা অ্যাড্রিনাল ও পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা।
তীব্র ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি মাতাল মনে হতে পারেন। কথা জড়িয়ে যেতে পারে বা হাঁটতে সমস্যা হতে পারে।
অন্যান্য লক্ষণ
- উদ্বেগ
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক মনে হওয়া
- ফ্যাকাশে ত্বক
- কাঁপুনি
- ঘাম
- মুখের চারপাশে ঝিনঝিন অনুভূতি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং পেট ভরা অনুভূতি কমে যায়। ক্লান্ত থাকলে বেশি চর্বি ও ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়ে।
ঘুমের ঘাটতির অন্যান্য প্রভাব
- মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
- মেজাজের পরিবর্তন
- অসাবধানতা
- দিনের বেলায় তন্দ্রা
- ওজন বৃদ্ধি
উদ্বেগ বা মানসিক চাপ থাকলে শরীর কর্টিসল নামের হরমোন নিঃসরণ করে। এতে ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে।
চাপের সময় অনেকেই মিষ্টি বা চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খেতে চান। এটি মস্তিষ্কের উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
অন্যান্য লক্ষণ
- হঠাৎ রাগ
- ক্লান্তি
- মাথাব্যথা
- ঘুমের সমস্যা
- পেটের অস্বস্তি
সব খাবার সমানভাবে পেট ভরায় না। প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার ক্ষুধা কমাতে বেশি কার্যকর। যেমন চর্বিহীন মাংস, মাছ, ডাল, দুধ, ফল, সবজি ও পূর্ণ শস্য।
বাদাম, মাছ ও সূর্যমুখী তেলে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং পেট ভরা রাখতে সহায়ক।
অন্যদিকে পেস্ট্রি, সাদা পাউরুটি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্ট ফুডে পুষ্টি কম কিন্তু অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও কার্বোহাইড্রেট বেশি। এগুলো খেলে দ্রুত আবার ক্ষুধা লাগতে পারে।
খাবার ধীরে চিবিয়ে ও মনোযোগ দিয়ে খেলে তুলনামূলক কম খেয়েও পেট ভরা অনুভূতি পাওয়া যায়।
কিছু ওষুধ ক্ষুধা বাড়াতে পারে। যেমন অ্যালার্জির অ্যান্টিহিস্টামিন, কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড, কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ ও মানসিক রোগের ওষুধ।
কোনো ওষুধ শুরু করার পর হঠাৎ ওজন বাড়লে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর ক্ষুধা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এটি শিশুর বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
সাধারণত প্রথম তিন মাসে ১ থেকে ৫ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন বাড়তে পারে। পরের মাসগুলোতে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১ পাউন্ড করে ওজন বাড়া স্বাভাবিক।
গর্ভাবস্থার অন্যান্য লক্ষণ
- মাসিক বন্ধ হওয়া
- ঘন ঘন প্রস্রাব
- বমিভাব
- স্তন ব্যথা বা আকার বৃদ্ধি
গলার সামনে প্রজাপতি আকৃতির থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এটি বেশি সক্রিয় হলে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে।
এ অবস্থায় ক্ষুধা বাড়লেও ওজন কমে যেতে পারে।
অন্যান্য লক্ষণ
- দ্রুত হৃদস্পন্দন
- উদ্বিগ্ন অনুভব
- অতিরিক্ত ঘাম
- পেশি দুর্বলতা
- পানি খাওয়ার পরও পিপাসা
অনেকে ক্যালরি কমাতে চিনিমুক্ত সফট ড্রিংক পান করেন। কিন্তু কৃত্রিম মিষ্টি মস্তিষ্ককে ক্যালরি আসছে এমন সংকেত দেয়। পরে শরীর ক্যালরি না পেলে ক্ষুধা বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে মাথাব্যথা, মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা ও ওজন বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় তৃষ্ণাকে আমরা ক্ষুধা ভেবে ভুল করি। পর্যাপ্ত পানি না খেলে ক্ষুধা বেশি লাগতে পারে।
পানিশূন্যতার লক্ষণ
- মাথা ঘোরা
- ক্লান্তি
- কম প্রস্রাব বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব
খাবারের আগে এক গ্লাস পানি খেলে কম ক্যালরিতেই পেট ভরা অনুভূতি আসতে পারে।
ব্যায়াম করলে শরীর বেশি ক্যালরি পোড়ায় এবং বিপাকক্রিয়া বাড়ে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষুধা বাড়তে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
সব সময় ক্ষুধা লাগা শুধু খাবারের অভ্যাসের বিষয় নয়, এর পেছনে শারীরিক বা মানসিক নানা কারণ থাকতে পারে। ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ কিংবা পানিশূন্যতা—সবই ক্ষুধা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্ষুধা অনুভব করলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম সুস্থ জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: ওয়েব এমডি
মন্তব্য করুন








