কারও দিনের শুরুতে চোখ খুলে যায় চায়ের চুমুকে। আবার কফির গন্ধ ছাড়া অনেকের সকালই শুরু হতে চায় না। একটি চমৎকার দিনের শুরুর জন্য কোনটি আপনার কাছে সবচেয়ে ভালো? পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়ার আগে একটু খেয়াল রাখতে হবে কোন পানীয়টি স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে।
বলতে পারেন, চা বা কফির সঙ্গে স্বাস্থ্যের বিষয় কীভাবে জড়িত? তাহলে জানিয়ে রাখি, কফি ও চায়ের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের যোগসূত্র থাকার পেছনে কিছু গ্রহণযোগ্য কারণ আছে। এর শুরুটা হয় ক্যাফেইন দিয়ে।
গবেষণাগুলোতে চা ও কফিতে উপস্থিত অন্যান্য উপাদানের চেয়ে ক্যাফেইনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, ক্যাফেইন সরাসরি সতর্কতা এবং একাগ্রতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি দূর করে।
ক্যাফেইন কোনটিতে বেশি, চা নাকি কফি?
সাধারণ প্রতি আউন্স কফিতে চায়ের তুলনায় ক্যাফেইনের পরিমাণ বেশি থাকে। আর ঠিক এ কারণেই উদ্দীপক হিসেবে অধিকাংশ মানুষ কফি বেছে নেন। পরিমাণ হিসাব করে বলতে গেলে, ৮ আউন্সের এক কাপ কফিতে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। চায়ে ক্যাফেইনের পরিমাণ এর ধরনের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন, গ্রিন টি-তে ক্যাফেইনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। এর প্রতি ৮ আউন্সে প্রায় ৪০ থেকে ৭০ মিলিগ্রাম। অন্যান্য চায়ে এর পরিমাণ আরও কম এবং অনেক ভেষজ চায়ে ক্যাফেইন থাকে না বললেই চলে। স্বাস্থ্যের দিক থেকে কফি ছেড়ে চা পান শুরু করার মতো কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। তবে সকালের পানীয়তে কিছুটা বৈচিত্র্য আনতে আপনি চাইলে ক্যাফেইনযুক্ত বিভিন্ন ধরনের চায়ের স্বাদ নিতে পারেন।
কতটুকু ক্যাফেইন শরীরের জন্য ভালো
দৈনিক মোট ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। কফি পান এবং সুস্বাস্থ্যের মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে করা অধিকাংশ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে আদর্শ। তবে ক্যাফেইনের পরিমাণ খুব সামান্য হলেও অনেক সময় কিছু মানুষের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এটি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ২০২৪ সালে ‘দ্য জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম'-এ প্রকাশিত একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইনযুক্ত চা বা কফি পান করা ডায়াবেটিস, করোনারি আর্টারি ডিজিজ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে যুক্ত।
চা নাকি কফি?
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা কফি বা চা পান করেন না তাদের তুলনায় যারা এগুলো পান করেন তারা বেশি স্বাস্থ্যগত সুবিধা পেতে পারেন। তবে এ সবই মূলত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। এর মানে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে, কফি বা চা সরাসরি সুস্বাস্থ্যের কারণ। উভয় পানীয়ই হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ কমানো এবং সতর্কতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। চা ও কফি, উভয়ই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস, যা 'ফ্রি র্যাডিক্যাল' এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক যৌগের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
চায়ের উপকারিতা
কফির মতো চা-তেও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অন্যান্য বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ রয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। বিভিন্ন চায়ের উপকারিতা বিভিন্ন রকম। যেমন ব্ল্যাক টি রক্ত সঞ্চালন এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এ ছাড়া এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, প্রদাহ কমায়, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম, রক্তে শর্করার মাত্রা ও মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে। ব্ল্যাক টি এবং ওলং টি-এর মতো একই উদ্ভিদ থেকে আসে গ্রিন টি। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। গবেষকরা এর সম্ভাব্য উপকারিতার মধ্যে উল্লেখ করেছে, ক্যানসার প্রতিরোধ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, প্রদাহ রোধ, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে ভেষজ চা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং উদ্ভিদজাত যৌগে সমৃদ্ধ, যা হজম, মানসিক চাপ মুক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ঘুম এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে উপকারে আসতে পারে।
কফি খাবেন কেন
কফি একটি বহুল গবেষণালব্ধ পানীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে কফি পানের সম্ভাব্য কিছু সুবিধা রয়েছে। কফি হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি হ্রাস করে। উচ্চ রক্তচাপ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার এবং লিভারের রোগ প্রতিরোধ করে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ এবং পার্কিনসন রোগের ঝুঁকি কমায়। কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং ক্যানসাররোধী উপাদানের কারণেই এ সুবিধাগুলো পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিপস
অতিরিক্ত চিনি এবং ফুল-ফ্যাট দুধ যোগ করলে কফি বা চায়ের প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই এগুলো পরিমিত ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যারা ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান, তাদের জন্য ক্যামোমাইল বা আদা চা চমৎকার বিকল্প হতে পারে। ক্যাফেইনের কারণে যদি আপনার বুক ধড়ফড় করা, অনিদ্রা বা দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়, তবে আপনার ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় দৈনিক ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমাবদ্ধ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: ভেরিওয়েল হেল্থ, হার্ভার্ড হেলথ
মন্তব্য করুন








