রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মসংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময়। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে ও না পান করে রোজা রাখা শুধু শরীরের অনুশীলন নয়, এটি আত্মিক উন্নতি ও দরিদ্র মানুষের কষ্ট অনুভবেরও সুযোগ।
তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে শরীর যেন দুর্বল না হয়ে পড়ে, সে জন্য ইফতার ও সাহরিতে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন করা খুবই জরুরি। পরিকল্পনা করে খাবার গ্রহণ করলে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পায়। কারও যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকে, তাহলে রোজার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নিচে রমজানে খাওয়ার জন্য উপকারী কিছু খাবারের তালিকা তুলে ধরা হলো।
খেজুর : ইফতার শুরুতে খেজুর খাওয়া সুন্নত। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা দ্রুত শক্তি জোগায়। এতে রয়েছে আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রন। তবে ডায়াবেটিস থাকলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
পানি : মানবদেহের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পানি। তাই রোজায় পানিশূন্যতা এড়াতে ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত। পানি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল রাখে। তরমুজ, শসা, মাল্টার মতো পানিযুক্ত ফলও উপকারী।
স্যুপ : সবজি, ডাল বা শস্য দিয়ে তৈরি স্যুপ সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর। ইফতারে হালকা স্যুপ খেলে শরীর ধীরে ধীরে খাবার গ্রহণে প্রস্তুত হয় এবং পানির ঘাটতি কমে।
ফলমূল : কলা, আপেল, কমলা, পেয়ারা, পেঁপে ইত্যাদি ফল ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের ভালো উৎস। এগুলো দ্রুত শক্তি দেয় এবং হজম ভালো রাখে। তবে ফলের রসের বদলে পুরো ফল খাওয়াই ভালো।
সবজি : পালং শাক, লাউ, ঝিঙে, গাজর, ব্রকলি, শিমসহ নানা সবজি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। আঁশ বেশি থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে।
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার : মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, ডাল ও ছোলা ভালো প্রোটিনের উৎস। এগুলো পেশি শক্ত রাখে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। ভাজাপোড়া এড়িয়ে গ্রিল, সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা ভালো।
জটিল শর্করা : লাল চাল, আটার রুটি, ওটস, ডালিয়া বা কিনোয়ার মতো খাবার ধীরে ধীরে শক্তি ছাড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা কম লাগে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা কম হয়।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার : দুধ, দই ও পনির ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের ভালো উৎস। সেহরিতে দই খেলে হজম ভালো থাকে। লাচ্ছি খেলে অতিরিক্ত চিনি বা লবণ না দেওয়া উত্তম।
বাদাম ও বীজ : কাঠবাদাম, আখরোট, চিনাবাদাম, তিল বা চিয়া বীজে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও আঁশ রয়েছে। অল্প পরিমাণে খেলে শক্তি বাড়ে ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত হয়।
মসুর ও অন্যান্য ডাল : ডালে প্রোটিন, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম থাকে। ডাল দিয়ে স্যুপ বা তরকারি তৈরি করা যায়। নিয়মিত ডাল খেলে হজম ভালো থাকে ও হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা পায়।
ছোলা : ছোলা প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ। ইফতারে সাদামাটা ছোলার চাট খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত মসলা বা তেল এড়িয়ে চলাই ভালো।
কিনোয়া : কিনোয়া প্রোটিন ও আঁশের ভালো উৎস এবং গ্লুটেনমুক্ত। এটি সালাদ বা ভাতের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যায়। যদিও দেশে সব জায়গায় সহজলভ্য নয়, পাওয়া গেলে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে।
ডিম : সেহরিতে ডিম খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে। এতে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রয়েছে। সেদ্ধ বা অল্প তেলে ভাজা ডিম ভালো বিকল্প।
মুরগির মাংস : সহজলভ্য ও পুষ্টিকর প্রোটিন। গ্রিল বা সেদ্ধ করে খাওয়া উত্তম। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে।
মাছ : মাছে প্রোটিন ও ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ভাজা মাছের বদলে ভাপা বা গ্রিল করা মাছ খাওয়া ভালো।
রসুন ও পেঁয়াজ : রান্নায় ব্যবহৃত এই দুটি উপাদানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে। তবে কাঁচা খেলে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
দই : দই হজমে সহায়ক এবং ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। সেহরিতে এক বাটি দই খেলে শরীর সতেজ থাকে।
স্মুদি : দই, ফল, বাদাম ও বীজ দিয়ে তৈরি স্মুদি শক্তি বাড়ায়। খেজুর দিয়ে তৈরি স্মুদি পুষ্টিকর হলেও অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো।
ভাপা দই বড়া : ইফতারে দই বড়া জনপ্রিয় খাবার। ডুবো তেলে ভাজার বদলে ভাপা বা এয়ার ফ্রাই করলে ক্যালরি কমে এবং পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। মুগ ডাল দিয়ে তৈরি করলে প্রোটিনও পাওয়া যায়।
- ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঝাল ও মিষ্টি এড়িয়ে চলুন
- একবারে বেশি না খেয়ে ধীরে ধীরে খান
- চা ও কফি কম পান করুন, কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয়
- সেহরি বাদ দেবেন না
- ইফতার ও সাহরির মাঝে হালকা হাঁটা শরীরের জন্য উপকারী
রমজানে সুস্থ থাকতে হলে সুষম ও পরিমিত খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। খাদ্যতালিকায় শর্করা, প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের সঠিক সমন্বয় থাকতে হবে। খেজুর, পানি, ফলমূল, সবজি, ডাল, মাছ, মাংস ও দুধজাত খাবার সঠিকভাবে গ্রহণ করলে দীর্ঘ সময় রোজা রাখা সহজ হয়।
সচেতন খাদ্যাভ্যাস শুধু রমজানেই নয়, সারা বছর সুস্থ জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই এই মাসকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি নতুন শুরু হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
সূত্র : ওলাডক
মন্তব্য করুন








