রাইস ডায়েট হলো স্বল্পমেয়াদি একটি খাদ্যতালিকা, যা ক্যালরি, চর্বি, লবণ ও প্রোটিনে কম কিন্তু শর্করায় বেশি। এটি প্রথম চালু হয় ১৯৩৯ সালে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের চিকিৎসা সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে।
পরে দ্রুত ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে অনেকেই এই ডায়েট অনুসরণ শুরু করেন। ২০০৬ সালে The Rice Diet Solution বই প্রকাশের পর এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়।
নামের কারণে অনেকেই ভাবেন এই ডায়েট মানেই শুধু ভাত খাওয়া। আসলে তা নয়। এতে বিভিন্ন ধরনের সম্পূর্ণ শস্য, ফল, শাকসবজি, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার, কম লবণযুক্ত ডাল ও লিন প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরিকল্পনাটি দাবি করে, এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে, শরীরকে পরিশুদ্ধ রাখে এবং পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার দিয়ে তৃপ্ত রাখে।
কত ওজন কমতে পারে
বইটির দাবি অনুযায়ী, প্রথম মাসে গড়ে নারীরা প্রায় ১৯ পাউন্ড এবং পুরুষরা ৩০ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন কমাতে পারেন। তবে বাস্তবে ফল ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়।
এই পরিকল্পনায় শুধু খাবার নয়, নিয়মিত ব্যায়াম, খাবারের তালিকা লিখে রাখা এবং ধ্যান করার পরামর্শও দেওয়া হয়, যাতে শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
রাইস ডায়েট কীভাবে কাজ করে
এই ডায়েট খুবই কম লবণযুক্ত। সোডিয়াম ক্ষুধা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, তাই লবণ কমালে ক্ষুধাও কিছুটা কমে। একই সঙ্গে উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে কম ক্যালরিতেই পেট ভরা অনুভূতি পাওয়া যায়। ডায়েটটি তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।
ডায়েটটির তিনটি ধাপ
প্রথম ধাপ, ডিটক্স পর্যায়
প্রতিদিন প্রায় ৮০০ ক্যালরি গ্রহণ করা হয়। প্রথম দিন শুধু শর্করাযুক্ত খাবার যেমন ভাত, রুটি, পাস্তা, আলু এবং ফল খাওয়া হয়। পরবর্তী ছয় দিনে ডাল, শাকসবজি ও ফ্যাটবিহীন দুধ যোগ করা যায়। প্রতিদিন সোডিয়াম ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রামের মধ্যে সীমিত রাখা হয়।
দ্বিতীয় ধাপ, ওজন কমানোর পর্যায়
প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ক্যালরি গ্রহণ করা হয়। ফল ও শর্করা একদিন, এরপর পাঁচদিন ফল, শর্করা, ডাল, শাকসবজি ও ফ্যাটবিহীন দুধ খাওয়া হয়। সপ্তম দিনে মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার বা লিন মাংস যোগ করা যায়।
তৃতীয় ধাপ, রক্ষণাবেক্ষণ পর্যায়
প্রথম ধাপের মতো হলেও ধীরে ধীরে ক্যালরি বাড়ানো হয়, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত ওজন অর্জিত হয়। টোফু, পনির, বাদাম, বীজ ও অলিভ অয়েল যোগ করা যায়। সোডিয়াম বাড়িয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত নেওয়া হয়।
এখানে সরাসরি ক্যালরি গণনা না করে খাবারকে নির্দিষ্ট পরিমাপে ভাগ করা হয়। যেমন আধা কাপ রান্না করা শস্য একটি স্টার্চ হিসেবে ধরা হয়, আর একটি মাঝারি ফল একটি ফলের পরিমাণ হিসেবে গণ্য হয়।
কী কী খাওয়া যায়
এই ডায়েটে সম্পূর্ণ শস্য, ফল, শাকসবজি, কম চর্বিযুক্ত বা চর্বিবিহীন দুধ, কম লবণযুক্ত ডাল এবং লিন প্রোটিন খাওয়া যায়। অতিরিক্ত তেল বা লবণ ব্যবহার করা যাবে না। স্বাদের জন্য হার্বস, লেবু, ভিনেগার ব্যবহার করা হয়।
পানীয় হিসেবে পানি, হার্বাল চা, চিনি ছাড়া ফলের রস এবং কম চর্বিযুক্ত দুধ নেওয়া যায়। অ্যালকোহল ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কতটা কঠোর এই ডায়েট
হিউস্টনের UTHealth Houston–এর পুষ্টিবিদ ডোলোরেস উডসের মতে, রাইস ডায়েট অত্যন্ত কঠোর। এতে ক্যালরি, লবণ, চর্বি ও চিনি একসঙ্গে কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির ঘাটতি হতে পারে, তাই সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে কম হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকতে পারে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।
স্বাস্থ্য উপকারিতা
রাইস ডায়েট মূলত উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য তৈরি হয়েছিল। Duke University School of Medicine–এর গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ডায়েট রক্তচাপ ও ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কম লবণ ও কম চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমতে পারে। টাইপ–২ ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এটি কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
সম্ভাব্য ঝুঁকি
খুব কম ক্যালরি গ্রহণের কারণে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা ক্লান্তি হতে পারে। প্রোটিন কম থাকলে পেশি কমে যেতে পারে। গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা যাদের খাদ্যজনিত মানসিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এই ডায়েট উপযুক্ত নয়।
দীর্ঘমেয়াদে এত সীমাবদ্ধ খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা বেশিরভাগ মানুষের জন্য কঠিন।
এটি কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই
খাবার সহজলভ্য হলেও নিয়মগুলো কঠোর হওয়ায় দীর্ঘ সময় মেনে চলা কঠিন। সামাজিক অনুষ্ঠান বা বাইরে খাওয়ার সময় এই ডায়েট অনুসরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; বরং স্বল্পমেয়াদি শুরু হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
রাইস ডায়েট একটি কম ক্যালরি, কম লবণ ও কম চর্বিযুক্ত খাদ্য পরিকল্পনা, যা দ্রুত ওজন কমাতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও কঠোর হওয়ায় সবার জন্য উপযোগী নয়।
কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে বা দ্রুত ওজন কমানোর প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে স্বল্পমেয়াদে এই পরিকল্পনা অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পন্থা।
সূত্র: ওয়েব এমডি