কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেঙ্গুইন ভাইরাল হয়েছে। মাইলের পর মাইলজুড়ে থাকা বরফের মধ্যে একা হেঁটে যাচ্ছে পেঙ্গুইনটি। আন্টার্টিকার ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, পেঙ্গুইনটি দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বরফের পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
ওই ছোট্ট ক্লিপ ইতোমধ্যেই লাখ লাখ ভিউ হয়েছে। হাজারও নেটিজেন ভিডিওটি শেয়ার করেছেন। তবে কেন পেঙ্গুইনটি দলছাড়া হলো এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একেকজন একেক মত দিয়েছেন।
কেউ কেউ আবার ওই পেঙ্গুইনের মধ্যে জীবনদর্শন, অনুপ্রেরণা খুঁজে পাচ্ছেন। কেউ আবার খুঁজে পেয়েছেন একরাশ কষ্ট। কিন্তু একা এই পেঙ্গুইনের আসল কাহিনি কী, তা অনেকেই জানেন। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া পেঙ্গুইনটির নাম দেওয়া হয়েছে নিহিলিস্টি পেঙ্গুইন। এখন প্রশ্ন, একা এই পেঙ্গুইনটি হেঁটে যাওয়ার বিশেষত্ব কী? কেন এত ভাইরাল বিশ্বজুড়ে?
ভাইরাল পেঙ্গুইনের ছবি ও ভিডিও প্রায় ১৯ বছর আগের একটি ডকুমেন্টারি। জার্মান পরিচালক ওয়ার্নার হার্জোগ তার ‘এনকাউন্টার অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ তথ্যচিত্রে একটি অ্যাডিলি পেঙ্গুইনের নিজের দল থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তুলে ধরেন। যেখানে বাকি পেঙ্গুইনরা খাবারের খোঁজে পানির দিকে যাচ্ছিল, সেখানেই একটি পেঙ্গুইন একা একা বরফাবৃত পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
পেঙ্গুইনরা সাধারণত দলবদ্ধ থাকে। তবে ওই পেঙ্গুইনের এই স্বভাববিরুদ্ধ আচরণই সবাইকে চমকে দিয়েছিল। পরিচালক ওয়ার্নার হার্জোগ এই দৃশ্যকে বলেছিলেন ‘ডেথ মার্চ’। পেঙ্গুইনটি আদৌ তার গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে কি না, তা কেউ জানে না। হতে পারে সেই পেঙ্গুইনটি জীবিতও ছিল না। আর প্রায় দুই দশক পর সেই পেঙ্গুইনটিই এখন ইন্টারনেট ট্রেন্ডে।
২০০৭ সালের ওই তথ্যচিত্রের পরিচালক ওয়ার্নার জানিয়েছিলেন, সত্যিই ওই পেঙ্গুইনের মৃত্যু হয়। অ্যান্টার্কটিকায় ৭০ কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার পর পেঙ্গুইনের মৃত্যু হয়। অনেকেরই দাবি, ওই পেঙ্গুইনের সঙ্গীর মৃত্যু হয়েছিল। তাই তার মন ভেঙে গিয়েছিল। সে কারণেই দল ছেড়ে একা একা চলে যায় পেঙ্গুইনটি।
নিহিলিস্টি পেঙ্গুইন মিম
তথ্যচিত্রটি অ্যান্টার্কটিকার কঠিন পরিবেশে থাকা পেঙ্গুইনদের জীবনাচার তুলে ধরা হয়। দৃশ্যটিতে পেঙ্গুইনটির একাকিত্ব ও ভীতিকর পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। আর এই দৃশ্যটিকে উপভোগ করছেন নেটিজেনরা। নিজেদের সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে নিহিলিস্টি পেঙ্গুইন হওয়ার বাসনা জানিয়েছেন।
হার্জোগ বলেছেন, মানুষ যেহেতু পেঙ্গুইনটির আত্মহত্যার প্রক্রিয়া থামাতে পারে না, তাই কোনো সাহায্যই এই দুর্দান্ত সাঁতারু প্রাণীটির জন্য উপকারী নয়। এই দৃশ্যটি অনেক দিন ধরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই জানুয়ারিতে টিকটকে ভাইরাল হয়। টিকটকাররা এটি গিগি ডি'আগোস্টিনোর ট্র্যাকের সঙ্গে মিলিয়েছে, যা দৃশ্যটির আবেগকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এরপর থেকে এই পেঙ্গুইনের অতৃপ্তি ও নিরাশার ছবি ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক টিকটক ব্যবহারকারী নিজেদের ‘নিহিলিস্টি পেঙ্গুইনের’ মতো ভ্রমণের ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করেন। তারা পোস্টের ক্যাপশনে লিখছেন ‘সেই পেঙ্গুইন হও’।
কেন ভাইরাল হয় ‘নিহিলিস্টি পেঙ্গুইন’
চলতি বছরের শুরুতে পেঙ্গুইনটি ভাইরাল হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন নেটিজেনরা। কেউ ওই পেঙ্গুইনের একা হেঁটে যাওয়ার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন ‘একলা চলোর’ বার্তা। গতানুগতিক ৯-৫টার কাজ না করে, কিংবা সকলের অনুসরণ করা পথে না হেঁটে নিজের মতো অনুযায়ী অন্য পথে চলাকে তুলে ধরা হয়েছে। কেউ আবার বলছেন, সবাই যে এখন একাকিত্বে ভুগছেন, তারই প্রতিচ্ছবি এই পেঙ্গুইন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, কাজের চাপ কিংবা কোথাও বাঁধন ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার প্রতীক মনে করছেন।
নিঃসন্দেহে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে বরফ আচ্ছাদিত প্রান্তরে পেঙ্গুইনের এই ভিডিওটি বেশ সাড়া ফেলেছে। নিহিলিস্টি পেঙ্গুইন মিম ছড়িয়ে পড়া আজকের অস্থির ও ডিজিটাল দুনিয়ার প্রভাবকে ইঙ্গিত করে। ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু ‘অনলাইন’ মানুষ এই মিমটি আবার সামনে নিয়ে আসে, তাতে এআই দিয়ে বানানো নানা সংস্করণ যোগ করে।
হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল এক্স ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এমন এআই-তৈরি ছবি পোস্ট করা হয়। তাতে পেঙ্গুইনটিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে গ্রিনল্যান্ডের পতাকার দিকে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেও মিমটির ট্রাম্প-সমর্থক সংস্করণ পোস্ট করা হয়। সেখানে ক্যাপশন ছিল ‘আমেরিকানরা সবসময়ই জানে কেন’।
সূত্র: ফোর্বস
মন্তব্য করুন








