ভালো ঘুম হলে সকালটা অনেক সুন্দর মনে হয়। মন থাকে ফুরফুরে, কাজে মনোযোগ আসে সহজে। কিন্তু যদি রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে দিনটা শুরুই হয় ক্লান্তি, বিরক্তি আর অস্থিরতা নিয়ে।
নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই রাতে ঘুম কেন ভাঙছে, সেটি জানা খুব জরুরি।
নিচে রাতে ঘুম ঠিকমতো না হওয়ার চারটি সাধারণ কারণ তুলে ধরা হলো—
বয়সের প্রভাব
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ঘুমের ধরন বদলে যায়। বয়স্কদের মধ্যে মাঝরাতে বা ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে শুধু বয়স হলেই যে ঘুম ভাঙবে, বিষয়টি এমন নয়।
আসলে বয়স বাড়লে শরীরের ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক সময়সূচি বা সার্কাডিয়ান রিদম বদলে যেতে পারে। ফলে কেউ কেউ সন্ধ্যার দিকেই ঘুমঘুম ভাব অনুভব করেন এবং খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। এটি অনেক সময় ঘুমের সমস্যা না হয়ে শরীরের স্বাভাবিক সময় পরিবর্তনের ফল হতে পারে।
জীবনযাপনের অভ্যাস
দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস রাতের ঘুম নষ্ট করার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—
ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মদ্যপান করলে প্রথমে ঘুম আসলেও পরে ঘুম ভেঙে যেতে পারে এবং বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
রাতে দেরিতে বা বেশি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে বুকজ্বালা হতে পারে, যা ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে।
বিকেলে বা সন্ধ্যায় দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে গভীর ঘুমে যেতে সমস্যা হয়।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কফি, চা বা কোমল পানীয় দুপুরের পর কম খাওয়াই ভালো।
এই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ঘুমের উন্নতি দেখা যায়।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধের কারণে রাতের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। যেমন—
কিছু বিষণ্নতার ওষুধ।
উচ্চ রক্তচাপের জন্য ব্যবহৃত কিছু ওষুধ।
অ্যালকোহলযুক্ত সর্দি-কাশির সিরাপ।
হাঁপানি বা প্রদাহের জন্য ব্যবহৃত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ।
যদি নিয়মিত কোনো ওষুধ খাওয়ার পর থেকে ঘুমের সমস্যা শুরু হয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। প্রয়োজনে ওষুধ খাওয়ার সময় পরিবর্তন বা বিকল্প ওষুধ দেওয়া হতে পারে।
ভেতরের কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা
বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যা রাতের ঘুমে বড় বাধা সৃষ্টি করে। এর মধ্যে রয়েছে—
দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা, যা ঘুম আসতে ও ধরে রাখতে সমস্যা করে।
প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ তৈরি হয়।
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, যা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় এবং ঘুম কম হলে ব্যথা আরও বাড়তে পারে।
স্নায়ুর সমস্যা, যার ফলে হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা ব্যথা হয়।
স্লিপ অ্যাপনিয়া, যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হয় এবং জোরে নাক ডাকার সঙ্গে ঘন ঘন ঘুম ভাঙে।
কীভাবে সামলাবেন
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়াকে স্বাভাবিক ভেবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনযাপনের অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভালো ঘুমের জন্য কিছু সাধারণ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
শান্ত, অন্ধকার ও ঠান্ডা পরিবেশে ঘুমান।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে নয়।
এসবের পরও যদি ঘুমের সমস্যা থেকে যায়, তাহলে অনিদ্রার জন্য বিশেষ আচরণগত চিকিৎসা পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে। এতে শিথিলকরণ কৌশল, পরামর্শভিত্তিক চিকিৎসা ও ঘুমের সময়সূচি ঠিক করার মাধ্যমে স্বাভাবিক ঘুম ফেরাতে সাহায্য করা হয়।
ভালো ঘুম সুস্থ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পেছনে বয়স, অভ্যাস, ওষুধ বা কোনো শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। কারণ, চিহ্নিত করে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে ঘুমের মান অনেকটাই উন্নত করা সম্ভব। নিয়মিত ও গভীর ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রামই দেয় না, বরং মন ভালো রাখে, কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নত করে।
সূত্র : হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং
মন্তব্য করুন








