আমাদের অনেকেই দুপুরে একটু ঘুমাতে চান না। অনেকেই ভাবেন দিনে ঘুমালে রাতে ভালো ঘুম হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অল্প সময়ের দুপুরের ঘুম আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতে দুপুরের ঘুম একটি স্বাভাবিক অভ্যাস। স্পেনে দুপুরের সিয়েস্তা (ঘুম) খুব পরিচিত। জাপানে অনেক কর্মজীবী মানুষ দুপুরের খাবারের পর অল্প সময় ঘুমান, যাকে বলা হয় হিরুনে। এমনকি আধুনিক কর্মক্ষেত্রেও দিনে ঘুমের সুবিধা রাখা হচ্ছে, যাতে কর্মীরা কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিতে পারেন। খবর বিবিসির
বর্তমানে পাওয়ার ন্যাপ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ছোট্ট ঘুম কি সত্যিই কাজে দেয়? এতে কি আসলেই আমরা সতেজ বোধ করি, নাকি আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ি? কতক্ষণ ঘুমানো ভালো এবং দিনের কোন সময়টা সবচেয়ে উপযোগী?
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত দুপুরের ঘুম মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য ও উরুগুয়ের গবেষকরা প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা সপ্তাহে কয়েক দিন নিয়মিত দুপুরে ঘুমান, তাদের মস্তিষ্কের আকার যারা কখনো দিনে ঘুমান না তাদের তুলনায় বড়। এই পার্থক্য মস্তিষ্কের বয়স বৃদ্ধির গতি প্রায় তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত ধীর করতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই ছোট হতে থাকে। ছোট মস্তিষ্কের আকারের সঙ্গে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি, হৃদরোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই যত বেশি সময় মস্তিষ্কের সুস্থতা ধরে রাখা যায়, ততই ভালো।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম যে স্মৃতির জন্য জরুরি, তা আগেই জানা ছিল। কিন্তু বড়দের ক্ষেত্রেও এর উপকারিতা আছে। মাত্র পাঁচ থেকে ১৫ মিনিটের ছোট ঘুম মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি দ্রুত বাড়াতে পারে। এই ইতিবাচক প্রভাব ঘুম থেকে ওঠার পর প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে।
খেলাধুলার জগতে এখন দুপুরের ঘুমকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামান্য পারফরম্যান্স উন্নত হলেও তা খেলোয়াড়দের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। দুপুরের ঘুম প্রতিক্রিয়ার সময় কমাতে, স্মৃতি সংরক্ষণে এবং মুড ভালো রাখতে সাহায্য করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুপুর ১টা থেকে ৪টার মধ্যে ঘুমালে শারীরিক ও মানসিক পারফরম্যান্স ভালো হয়। এই সময়টাতে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক শক্তি কিছুটা কমে যায়, তাই অল্প বিশ্রাম উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুপুরের ঘুম কখনোই রাতের ভালো ঘুমের বিকল্প হতে পারে না। যদি কেউ প্রায়ই দিনে ঘুমানোর প্রয়োজন অনুভব করেন, তাহলে আগে দেখা দরকার তিনি রাতে পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছেন কি না।
রাতের ঘুম আমাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্মৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করে। তাই রাতের ঘুম কমিয়ে দিনে ঘুমানো কোনো সমাধান নয়।
তবে যারা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, যেমন ছোট শিশুর বাবা-মা বা শিফটে কাজ করা মানুষ, তাদের জন্য পরিকল্পিতভাবে দুপুরে অল্প ঘুম উপকারী হতে পারে।
এটাও মনে রাখা দরকার, সবাই সহজে দিনে ঘুমাতে পারেন না। কারও জন্য এটি কার্যকর, আবার কারও জন্য নয়।
দুপুরের ঘুমের ক্ষেত্রে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি ঘুমানো উচিত নয়। সবচেয়ে ভালো সময় হলো দুপুর ২টা থেকে ৪টার মধ্যে।
এই সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বিশ্রামের দিকে যায়। এর বেশি সময় ঘুমালে গভীর ঘুম শুরু হতে পারে, ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভারী লাগে এবং কাজে মন বসতে চায় না। একে বলা হয় স্লিপ ইনর্শিয়া।
সকালে ঘুমানোর চেষ্টা করলে শরীর তখনো সক্রিয় থাকে, তাই ঘুম আসতে চায় না। আবার খুব দেরিতে ঘুমালে রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
দুপুরের অল্প সময়ের ঘুম সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে সঠিকভাবে করলে এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য, স্মৃতি ও কর্মক্ষমতার জন্য উপকারী হতে পারে। নিয়মিত ও সীমিত সময়ের পাওয়ার ন্যাপ মানসিক সতেজতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাতের পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা। দুপুরের ঘুম হতে পারে সহায়ক একটি অভ্যাস, কিন্তু এটি কখনোই ভালো রাতের ঘুমের বিকল্প নয়। নিজের শরীর ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
মন্তব্য করুন








