সহানুভূতি বা এম্প্যাথি নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা আছে—নারীরা নাকি স্বভাবতই বেশি সহানুভূতিশীল, আর পুরুষরা তুলনামূলকভাবে কম। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে এবং দেখাচ্ছে, বিষয়টি এত সরল নয়।
১৭০৫ সালে দার্শনিক মেরি অ্যাসটেলও (Mary Astell) লেখেন, কোনো নারী অসাধারণ কিছু করলে বলা হতো, তিনি আসলে স্কার্ট পরা পুরুষ। এমনকি রানি প্রথম এলিজাবেথে (Elizabeth I) নিজেও বলেছিলেন, তিনি দুর্বল নারীর শরীর নিয়ে রাজা হয়ে শাসন করবেন।
এসব উদাহরণ দেখায়, ক্ষমতা ও নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন পুরুষালি গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
আজও সূক্ষ্মভাবে এই মানসিকতা কাজ করে। আমরা সাধারণত সহানুভূতিকে নারীর স্বাভাবিক গুণ এবং কর্তৃত্ব বা দৃঢ়তাকে পুরুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখি। একই আচরণ করলে পুরুষকে বলা হয় দৃঢ়চেতা, আর নারীকে বলা হয় আগ্রাসী।
সহানুভূতি বলতে বোঝায় অন্যের অনুভূতি ও ভাবনা বোঝার এবং তার প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। এটি দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন:
- জ্ঞানগত সহানুভূতি, যেখানে আমরা অন্যের আবেগ চিনতে ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারি।
- আবেগীয় সহানুভূতি, যেখানে অন্যের অনুভূতির প্রতি আমাদের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বিভিন্ন প্রশ্নপত্র ও আচরণগত পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকেরা সহানুভূতি মাপেন। গড়ে নারীরা এসব পরীক্ষায় সামান্য বেশি নম্বর পান, এ তথ্য বহুদিন ধরেই প্রচলিত।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী সিমোন বার্নার-চোন (Simon Baron-Cohen) মনে করেন, নারীর মস্তিষ্ক সহানুভূতির দিকে এবং পুরুষের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ ও সিস্টেম বোঝার দিকে বেশি ঝোঁকপ্রবণ। তার গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা শিশুর কিছু জ্ঞানগত দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে তিনিও স্বীকার করেন, সহানুভূতি কেবল জীববিজ্ঞানের ফল নয়; সামাজিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে স্নায়ুবিজ্ঞানী জিনা রিপন (Gina Rippon) এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তার মতে, সব নারী স্বভাবতই বেশি সহানুভূতিশীল - এই ধারণা নারী মস্তিষ্ক নিয়ে প্রচলিত এক প্রচলিত ধারণা। শিশুদের মস্তিষ্ক খুবই সংবেদনশীল এবং পরিবেশের প্রভাব দ্রুত গ্রহণ করে।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় ৫৭টি দেশের মধ্যে ৩৬টিতে নারীরা সহানুভূতিতে এগিয়ে ছিলেন, তবে ২১টি দেশে পার্থক্য খুবই সামান্য। গবেষকরা স্পষ্টভাবে বলেন, ফলাফল এ কারণে নির্ধারণ করা যায়নি।
২০১৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বরুণ ওয়ারিয়ারের (Varun Warrier) নেতৃত্বে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এক জিনগত গবেষণায় দেখা যায়, সহানুভূতির কিছু অংশ জিন দ্বারা প্রভাবিত হলেও তা ব্যক্তির লিঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। গবেষণা বলছে, ব্যক্তিভেদে সহানুভূতির যে ভিন্নতা দেখা যায়, তার মাত্র ১০ শতাংশ জিনগত কারণে।
অনেক গবেষকের মতে, মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় নম্র হতে, অন্যের খেয়াল রাখতে, আবেগ প্রকাশ করতে। তাদের খেলনা ও সামাজিক প্রত্যাশাও অনেক সময় লালন-পালন ও যত্নশীলতার দিকে ঝোঁক তৈরি করে। বিপরীতে ছেলেদের শেখানো হয় শক্ত ও আত্মনির্ভর হতে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ক্ষমতা মানুষের সহানুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে। যারা নিজেদের সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে মনে করেন, তারা অনেক সময় অন্যের আবেগ বুঝতে বেশি দক্ষ হন। ইতিহাসে পুরুষরা বেশি ক্ষমতার অবস্থানে থাকায়, এই কাঠামোগত বাস্তবতাও সহানুভূতির প্রকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী নাথান স্প্রেং (Nathan Spreng) বলেন, সহানুভূতি স্থির গুণ নয়; এটি শেখা ও উন্নত করা যায়।
২০২৩ সালের এক স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, ব্যথার ছবি দেখালে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া প্রায় একই রকম। কিন্তু প্রশ্নপত্রে নিজেদের সহানুভূতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পুরুষেরা কম নম্বর দেন—যদি না আগে থেকে বলা হয় যে পুরুষেরাও সহানুভূতিশীল হতে পারে। এই তথ্য দেখায়, সামাজিক প্রত্যাশা মানুষের আত্মমূল্যায়নে প্রভাব ফেলে।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন অংশগ্রহণকারীদের অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয় অন্যের অনুভূতি সঠিকভাবে বোঝার জন্য, তখন নারী ও পুরুষ উভয়ের সহানুভূতির নির্ভুলতা বাড়ে। অর্থাৎ প্রেরণা থাকলে সবাই সহানুভূতিশীল হতে পারে।
সহানুভূতিকে নারীর গুণ হিসেবে দেখার ফলে নেতৃত্বে নারীরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন, কারণ নেতৃত্বকে এখনও দৃঢ়তা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
অন্যদিকে পুরুষদের আবেগ প্রকাশ না করার সামাজিক চাপ তাদের একাকীত্ব বাড়াতে পারে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আত্মহত্যার ঝুঁকির একটি বড় কারণ, আর বিশ্বজুড়ে পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীদের তুলনায় বেশি।
আয়ারল্যান্ডের টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ডাবলিনের সমাজবিজ্ঞানী নিয়াল হ্যানলন (Niall Hanlon) বলেন, ছেলেদের এমনভাবে বড় করা হয় যে যত্ন নেওয়া যেন তাদের দায়িত্ব নয়। তবে ধীরে ধীরে সমাজ বদলাচ্ছে। এখন অনেক পুরুষই পরিবার ও সন্তানের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে আগ্রহী।
গবেষণা বলছে, নারীরা স্বভাবতই বেশি সহানুভূতিশীল—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। জীববিজ্ঞান কিছু ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু পরিবেশ, সামাজিক প্রত্যাশা, ক্ষমতার কাঠামো ও ব্যক্তিগত প্রেরণা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সহানুভূতিকে যদি আমরা একটি পরিবর্তনশীল দক্ষতা হিসেবে দেখি, তাহলে নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এটি বিকশিত করা সম্ভব। এমন সমাজ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে আবেগ প্রকাশ বা যত্ন নেওয়া কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের গুণ হিসেবে দেখা হবে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত সহানুভূতি শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি—যা সমতা, সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ভিত্তি তৈরি করে।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন








