একটু কল্পনা করুন। আপনি চোখে কাজল পরছেন, আর সেই ছোট্ট কালো রেখার সঙ্গে যেন জুড়ে যাচ্ছে আপনার মা, দাদি কিংবা আরও বহু প্রজন্মের মানুষের স্মৃতি। শুধু সাজগোজ নয়, কাজল যেন ইতিহাস, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির এক নীরব ভাষা।
চোখের সৌন্দর্য বাড়াতে কাজল ব্যবহার করেন অনেকে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই কাজলের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো এক বিস্ময়কর ইতিহাস। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিভিন্ন সভ্যতায় কাজল শুধু সাজের উপকরণ নয়, বরং ছিল সুরক্ষা, আধ্যাত্মিকতা ও পরিচয়ের প্রতীক।
এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব এতটাই গভীর যে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো আরব অঞ্চলের কাজল ব্যবহারের ঐতিহ্যকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক ও সাংবাদিক জাহরা হানকির বলেন, তিনি যখন আমেরিকার ব্রুকলিনে নিজের ফ্ল্যাটে বসে আইলাইনার পরেন, তখন নিজেকে একা মনে হয় না। তার মনে হয়, তিনি যেন তার মা, দাদি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য নারীর সঙ্গে এক অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত হচ্ছেন।
ঐতিহ্যগতভাবে নারী ও পুরুষ উভয়েই কাজল ব্যবহার করে এসেছেন। এর ইতিহাস সভ্যতার একেবারে প্রাচীন সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। আরব বিশ্বে এটি পরিচিত কুহল নামে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় কাজল বা সুরমা, ইরানে সোরমে, নাইজেরিয়ায় তিরো এবং ইংরেজিতে কোল বা আইলাইনার। আগের দিনে কাজল তৈরি হতো অ্যান্টিমনি, সীসা বা প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ দিয়ে। বর্তমানে আধুনিক আইলাইনারে ব্যবহৃত হয় নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় উপাদান।
হানকিরের পরিবারের শিকড় লেবাননে। ১৯৭৫ সালের গৃহযুদ্ধের সময় তারা দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে যান। তিনি মনে করেন, কাজল ছিল তার মায়ের জন্য নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার এক নীরব উপায়। তিনি বলেন, ছোটবেলায় মাকে মেকআপ করতে দেখলে মনে হতো, তিনি যেন খুব গভীর কোনো অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। আজও আইলাইনার পরার সময় হানকির একই অনুভূতি পান।
তার লেখা বই আইলাইনার: অ্যা কালচারাল হিস্ট্রিতে তিনি উল্লেখ করেন, ইউনেসকোর স্বীকৃতি কাজলকে শুধু একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে তুলে ধরেছে। এই স্বীকৃতি কাজল তৈরির জ্ঞান, রীতি ও কারুশিল্পকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে সাহায্য করবে।

কাজলের ইতিহাস খুঁজলে ফিরে যেতে হয় প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও পারস্য সভ্যতায়। প্রাচীন মিশরে নারী পুরুষ সবাই কাজল ব্যবহার করত। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, চোখকে রোগ ও খারাপ শক্তি থেকে রক্ষা করার বিশ্বাসও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এমনকি মিশরীয়রা তাদের কবরেও কাজলের পাত্র রাখত, যেন পরকালেও এটি সঙ্গে থাকে। এতে বোঝা যায়, তাদের জীবনে কাজলের গুরুত্ব কতটা ছিল।
আইলাইনার ব্যবহারে সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্রগুলোর একজন ছিলেন মিশরের রানী নেফারতিতি। ১৯১২ সালে তার আবক্ষ মূর্তি আবিষ্কারের পর তার চোখের গাঢ় কাজল সারা বিশ্বের নজর কেড়ে নেয়। আজও ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে নেফারতিতির মেকআপ অনুকরণ করে অসংখ্য ভিডিও তৈরি হচ্ছে।
আইলাইনার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হানকির ঘুরেছেন ভারত, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মেক্সিকো ও জাপানসহ বহু দেশে। তিনি দেখেছেন, কাজলের ব্যবহার ও অর্থ অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও একটি বিষয় প্রায় সব জায়গায় মিল রয়েছে। সেটি হলো সুরক্ষা।
কোথাও সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে, কোথাও কুনজর এড়াতে, কোথাও ধর্মীয় আচার হিসেবে কাজল ব্যবহৃত হয়। অনেক জায়গায় শিশুদের চোখেও কাজল লাগানো হয় সুরক্ষার বিশ্বাস থেকে। বাংলাদেশেও এক সময় ছোট শিশুদের কপালে বা চোখে কাজল দেওয়ার প্রচলন ছিল, যা এখনো অনেক পরিবারে দেখা যায়।
জাপানে ঐতিহ্যবাহী গেইশা শিল্পীরা লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন, যা সুরক্ষা ও শুদ্ধতার প্রতীক। আবার মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে আইলাইনার পরিচয়, প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক গর্বের চিহ্ন। চাদে ওয়াদাবি নামের যাযাবর গোষ্ঠীর পুরুষরাও কাজল ব্যবহার করেন তাদের বার্ষিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায়। জর্ডানে বেদুইন পুরুষরা কাজল পরেন ধর্মীয় বিশ্বাস, সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা এবং সৌন্দর্যের জন্য।
হানকিরের মতে, কাজলকে ইউনেসকোর স্বীকৃতি অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল। এটি বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের, বিশেষ করে আরব বিশ্বের সেই জনগোষ্ঠীগুলোকে সম্মান জানায়, যারা যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক চাপের মধ্যেও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
তার কাছে কাজল শুধু একটি প্রসাধনী নয়। এটি নিজের শিকড়, ইতিহাস ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার এক ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, কাজল লাগানো মানে শুধু চোখে দাগ টানা নয়। এটি যেন এক ধরনের নীরব আচার, যা আপনাকে আপনার চেয়ে অনেক বড় একটি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে।
সূত্র : বিবিসি
মন্তব্য করুন








