ছাত্র- জনতার অভুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দেড় বছর। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলোতে এখনও আঁকা রয়েছে সেই সময়কার কিছু গ্রাফিতি। এগুলোর মূল বক্তব্য ছিল স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক সচেতনতা, বৈষম্যবিরোধী দাবি-দাওয়া ইত্যাদি।
ইদানীং পুরোনো দেয়ালচিত্রের পাশাপাশি অনেক দেয়ালে লেখা হয়েছে নতুন স্লোগান, নতুন রাজনীতির বার্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু দেয়ালে লেখা দেখা যায়, ‘দিল্লি না, ঢাকা’। কিন্তু এই স্লোগান কি সাধারণ ফিগার অব স্পিচমাত্র, নাকি এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নতুন পররাষ্ট্রনীতি সংগঠনের পেছনকার মনস্তত্ত্ব? বিবিসির বিশ্লেষণমূলক এক প্রতিবেদনে এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন সৌতিক বিশ্বাস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একসময় গণতন্ত্রের আইকন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও একসময় তিনি স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিলেন। পরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। খবর অনুযায়ী, শেখ হাসিনা এখন দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন, এবং ভারত বরাবরই তাকে ফেরত দিতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এদিকে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে ওই সহিংসতায় প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আয়োজিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘদিন সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় একটা গোটা প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটা হতে যাচ্ছে প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার ফলে এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, দেশের অন্যতম পুরোনো এই রাজনৈতিক দলটি একসময় জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ ভোট পেত।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের সেই ভোটব্যাংকটি হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ডানপন্থি রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি জোট বেঁধেছে অভুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের হাতে গড়ে ওঠে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপির সঙ্গে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে এখন দেখা যায়, তরুণ শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করছেন। তবে এসব বিতর্ক এখন আর শুধু স্বৈরাচার বা নির্বাচন নিয়ে নয়। বরং বিতর্কের বিষয়বস্তুতে স্থান পেয়েছে সীমান্তের বাইরের বিষয়াদিও। তরুণদের দৈনন্দিন কথোপকথনে ‘হেজেমনি’ বা ‘আধিপত্য’ ইত্যাদি শব্দগুলো মূলত বাংলাদেশের ওপর প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রভাবকে নির্দেশ করে। মোশাররফ হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম মনে করে ভারত বহু বছর ধরে আমাদের দেশে হস্তক্ষেপ করে আসছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর।’
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ে দিল্লির ভূমিকা দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশের যে সম্পর্ক একসময় প্রতিবেশী কূটনীতির মডেল হিসেবে প্রশংসিত হতো, সম্প্রতি সেই সম্পর্ক তিক্ততরায় রূপ নিয়েছে।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশে গভীর ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশের প্রতি কঠোর ও প্রতিকূল অবস্থানের কারণে দিল্লির প্রভাব এখন কমতে শুরু করেছে।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে তার ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা এবং এই বিষয়টিকে সমর্থন করার জন্য অনেকে দিল্লিকে দায়ী করেন এবং ভারতকে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী হিসেবে দেখেন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং সেগুলোতে দিল্লির সমর্থনের কথা মানুষ ভুলে যায়নি। মোশাররফ বলেন, ‘ভারত কোনো চাপ বা প্রশ্ন ছাড়াই হাসিনার সরকারকে সমর্থন করেছে। মানুষ মনে করে গণতন্ত্রের এই ধ্বংসযজ্ঞে ভারতের সমর্থন ছিল।’
বিশ্বাসঘাতকতার এই অনুভূতি সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমের উসকানিমূলক বক্তব্যের সঙ্গে মিশে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধারণা মজবুত করছে যে, ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং নিজের অধীন হিসেবে হিসেবে দেখতে পছন্দ করে।
এর মধ্যে সম্প্রতি আইপিএল থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া এবং বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাও বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সব ধরনের যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই যোগাযোগকে ইতিবাচক রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।’
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা সফর করেন এবং তখন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। পাশাপাশি ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছে দেশটি। জামায়াতে ইসলামীর একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভারতীয় কর্মকর্তারা গত এক বছরে অন্তত চারবার দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বিবিসিকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার আমলের সঙ্গে এখনকার সময়ের বৈপরীত্য স্পষ্ট। গত ১৭ বছর ধরে ঢাকা ভারতের জন্য সবগুলো পথই উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ। আর এখন কিছুই এগোচ্ছে না। না মানুষ, না মানুষের সদিচ্ছা।’
এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর দিল্লির প্রতিক্রিয়া মানুষের ক্রোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন ভারত তাদের বাংলাদেশ সম্পর্কিত নীতি পুনর্বিবেচনা করবে। তবে ভারত তাদের আগের সেই অবস্থান থেকে সরেনি। হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ভিসা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ কঠোর করেছে। এর ফলে ঢাকায় যে বার্তাটি পৌঁছেছে তা হলো বাংলাদেশিদের প্রতিবেশী হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, এমনটাই মনে করেন কামাল আহমেদ।
দুই দেশের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বিষয়টিকে আরও খারাপ করেছে। যখন ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে সম্বোধন করেন অথবা বাংলাদেশকে ‘ইসরায়েলি পদ্ধতিতে শিক্ষা’ দেওয়ার কথা বলেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। এর ফলে শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক পাল্টা আঘাত যেমন, ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক, আইপিএল সম্প্রচার স্থগিত করা। কামাল আহমেদ বলেন, ‘সংস্কৃতি, বাণিজ্য, সম্মান, কোনোটিই একতরফা বিষয় নয়। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব একতরফাভাবে এটি চর্চা করছে।’
তবে ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘বহুমাত্রিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা রাজনীতির মতোই ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। প্রায় ২ হাজার ৫৪০ মাইল দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বাণিজ্য প্রবাহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আমাদের ভাষা এক, আমাদের ইতিহাস এক।’
জনগণের প্রতিক্রিয়া যে কঠোর, তা স্বীকার করেন শফিকুল আলম । তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিদের যদি জিজ্ঞেস করেন কেন তারা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি, তবে অনেকে একই উত্তর দেন, শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন এবং তাতে ভারতের সমর্থনের কারণে।’
শফিকুল আলমের মতে শেখ হাসিনার মতো কলঙ্কিত একজন, যিনি ছাত্র হত্যার দায়ে অভিযুক্ত, ভারতের তাকে আপ্যায়ন করার বিষয়টিও জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনকেও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বলে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, ভারত বলছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলসহ ২ হাজার ৯০০টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা রাজনৈতিক সহিংসতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আলী রীয়াজ বর্তমানে ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মনে করেন দুই দেশের মধ্যকার এই ফাটল ভুল-বোঝাবুঝির চেয়েও গভীর। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধগুলো এই ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আলী রীয়াজ পানি বণ্টনের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবেই অসম হয়ে পড়ে।’
সীমান্ত হত্যা এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশিদের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তার মাপকাঠি হিসেবে এটিকে সেখা হয়।
সমালোচকদের মতে, হাসিনার পতনের পর এই ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হয়েছে। অন্তবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ভারত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হারিয়েছে। আমরা বেশ কয়েকবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ছিল কখনও ইতিবাচক ছিল, আবার কখনও নেতিবাচক।’
নির্বাচনি প্রচারণায় ভারতবিদ্বেষী সুর এখন কিছুটা স্তিমিত। কারণ, প্রতিটি রাজনৈতিক দলই জানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মেরামত দ্রুত বা বাহ্যিক কোনো পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব হবে না। শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার আসলেই সম্পর্কের পুনর্গঠন সহজ হবে, এমন না। পেছনের সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।’
তবে এই ফাটল জোড়া লাগানো অসম্ভব নয় বলে মনে করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়, এই সম্পর্ক মেরামতের দায়ভার মূলত দিল্লির ওপর এবং এর জন্য তাদেরকে প্রতিবেশী দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
বিবিসিতে প্রকাশিত ‘Is Bangladesh's youth turning against India?’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।
মন্তব্য করুন








