ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের পাল্টা হামলায় এক হাজার ২০০ ইসরায়েলি ইহুদি নিহতের ঘটনায় পুনরায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের জনগণের পাশে সবসময় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি আন্তর্জাতিক হলোকাস্ট স্মরণ দিবস উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। এতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাডে’ নিহত ইসরায়েলি ইহুদিদের প্রতি সমবেদনা জানায় ভারত সরকার।
বিক্রম মিশ্রি সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানান এবং পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার, কূটনৈতিক মহলের সদস্য ও ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, হলোকস্ট শুধু অকল্পনীয় মানবিক দুর্ভোগের ইতিহাস নয়; এটি একটি সতর্কবার্তাও যে, ঘৃণা কীভাবে ‘শব্দ দিয়ে’ শুরু হয়। অমানবিকীকরণ, বর্জন ও কুসংস্কারের ভাষা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
পররাষ্ট্র সচিব অতীতের ভয়াবহতা ও বর্তমান সহিংসতার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হলোকস্টের পর আর কোনো একদিনে এত বেশি ইহুদি নিহত হয়নি। মিশ্রি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত এই ধরনের নির্বোধ বর্বরতার সঙ্গে খুব পরিচিত’।
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের শিকার হিসেবে ভারত ইসরায়েলের বেদনার প্রতি গভীর সহানুভূতি অনুভব করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মিশ্রি স্মরণ করিয়ে দেন, ভারত এই হামলার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যে বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত ইসরায়েলের জনগণের পাশে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদকে সবসময় নিন্দা জানাতে হবে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না, তা যেখানেই ঘটুক।’
একই সঙ্গে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব ও আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতি ভারতের ধারাবাহিক সমর্থনের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব। গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শান্তির একটি কার্যকর পথ দেখায়। যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তিসহ সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে তিনি স্বাগত জানান, যা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি এনেছে।
ভারতের অবস্থানকে একটি বৃহত্তর সভ্যতাগত প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে মিশ্রি বলেন, হলোকস্ট স্মরণ শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়; এটি বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার একটি নৈতিক আহ্বান। তিনি বলেন, এসব মূল্যবোধ ভারতের সংবিধান ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি দেশ, যেখানে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী মর্যাদার সঙ্গে আশ্রয় পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (বিশ্ব এক পরিবার) এবং সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার নীতির কথা উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও ইহুদি জনগণের পাশে ভারতের অবস্থানের কথা স্মরণ করে মিশ্রি বলেন, যখন বিশ্বের বহু দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। ঐতিহাসিক এই সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে তিনি বনি ইসরায়েলি, কোচিনি ইহুদি, বাগদাদি ইহুদি ও বনি মেনাশে—ভারতের প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর কথা তুলে ধরেন, যারা দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। ইহুদি শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নওয়ানগরের মহারাজাকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সম্প্রতি সম্মানিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মিশ্রি বলেন, ‘এই গভীরমূল ঐতিহাসিক সম্পর্কই আজ একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে’। তার ভাষায়, ভারত ও ইসরায়েল এখন ‘অগ্রগতির পথে গর্বিত অংশীদার’, যারা অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার সেতু গড়ে তুলছে।
মন্তব্য করুন








