ইরানের চলমান সহিংস বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষ নিহতের কথা অকপটেই স্বীকার করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলের বাজার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে ছোট ও বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে নাগরিক নিহতের এই স্বীকারোক্তি ‘অস্বাভাবিক’ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ অতীতে ইরানে বিক্ষোভ দমনের সময় প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে খামেনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করা এড়িয়ে গেছেন।
তবে এই অস্থিরতার প্রকৃত চিত্র ও দায় নিয়ে ইরান বিদেশি বিরোধী গোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) রয়টার্সকে ইরানের একটি সরকারি সূত্র নিশ্চিত করে যে, চলমান সহিংস বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, নিহতের এই সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ২০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। যদিও সংস্থাগুলো এই দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
‘নিরপরাধ ইরানিদের’ হত্যার জন্য ‘সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছে দেশটির সরকার। খামেনি স্পষ্ট করে এই দায় শত্রু দেশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়েছেন। তারা বাইরে থেকে ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ উসকে দিচ্ছে বলেও দাবি তার। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট করে। এত নাগরিক নিহতের দায় দেশটির সরকার অস্বীকার করেছে। এতেই প্রশ্ন উঠেছে কারা হত্যা করল এত মানুষকে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসা ও বাণিজ্য এলাকায় অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক দিনে তা সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাত ছিল সবচেয়ে সহিংস।
ইরানের মেডিকেল পরীক্ষক কর্তৃপক্ষের প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিহতদের অনেককে খুব কাছ থেকে বুকে বা মাথায় গুলি করা হয়েছে। কেউ কেউ ছাদ থেকে ছোড়া বুলেটে বিদ্ধ হয়েছেন, আবার কয়েকজন ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিহত বিক্ষোভকারীদের বড় অংশই তরুণ, যাদের অনেকের বয়স ২০-এর কোঠায়।
গত ৮ জানুয়ারি রাতে ইরানি কর্তৃপক্ষ মোবাইল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ করে দেয়। এতে জরুরি সেবা ডাকার সুযোগও ছিল না। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে যোগাযোগ ব্যবস্থা আংশিকভাবে ফিরতে শুরু করে। বর্তমানে স্থানীয় কল, এসএমএস ও আন্তর্জাতিক আউটগোয়িং কল চালু হয়েছে। সীমিত পরিসরে একটি অভ্যন্তরীণ ইন্ট্রানেট সক্রিয় থাকলেও, প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার বড় অংশ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
রাস্তায় বিক্ষোভ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভারী অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনী টহল ও চেকপয়েন্ট বসিয়েছে। ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের কারণে ইরানের ভেতরের ভিডিও ও তথ্য বাইরে পৌঁছানো সীমিত। তবে কিছু মানুষ দেশ ত্যাগ করে অথবা সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে তথ্য প্রচার করেছেন।
সরকারের বক্তব্য
ইরানি সরকার দাবি করছে, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত। তাদের অভিযোগ, বিদেশি শক্তির সহায়তায় সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত গোষ্ঠী সহিংসতা চালিয়েছে। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অস্থিরতায় সরাসরি জড়িত থাকার জন্য ‘অপরাধী’ বলে অভিহিত করেছেন।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী নয়, বরং ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী, যারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি ও ছুরিকাঘাত চালিয়েছে। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, যাদের তারা ‘দাঙ্গাকারী’ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে বিক্ষোভ-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্ট ও প্রসিকিউটরের দপ্তর যৌথ ওয়ার্কগ্রুপ গঠন করেছে।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দাবি
বিদেশে অবস্থানরত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৩০০ জনের বেশি মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও চার হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু তদন্তাধীন। সংস্থাটির হিসাবে, দুই হাজার ১০৭ জন গুরুতর আহত এবং ২৪ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তার মতে, নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটেছে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকায়। আল-জাজিরা জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এসব পরিসংখ্যান যাচাই করতে পারেনি।
বিদেশি গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারকে দাফনের অনুমতির বিনিময়ে তথাকথিত ‘বুলেট মানি’ দিতে বাধ্য করা হয়েছে, অথবা নিহতদের বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে স্বীকার করে নথিতে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়া হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, বিশেষ করে জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক নেতৃত্বের পতনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে ট্রাম্প ইরানিদের রাস্তায় থাকার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, ‘সাহায্য আসছে’। তিনি আরও বলেন, ৮০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দির পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের প্রসিকিউটর আলী সালেহি বলেন, ট্রাম্প ‘ভিত্তিহীন কথা বলছেন’ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে ‘দ্রুত ও নিরুৎসাহিতকারী’। তবে ট্রাম্প তার বক্তব্য অব্যাহত রেখে খামেনির ৩৭ বছরের শাসনের অবসানের আহ্বান জানান এবং তাকে ‘অসুস্থ মানুষ’ বলে আখ্যা দেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন। তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যম কান জানিয়েছে, ঐতিহ্যমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু দাবি করেছিলেন ,যে ইরানে ইসরায়েলি তৎপরতা এখনও চলছে। এরপর নেতানিয়াহু কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে নিষেধ করেন।
মন্তব্য করুন








