উচ্চতা অনেক সময় সমাজে প্রশংসিত হয়। লম্বা মানুষকে অনেকেই ভাগ্যবান বা আকর্ষণীয় মনে করেন। বাজারে পোশাকের মডেল, খেলাধুলায় সুবিধা, ভিড়ের মধ্যে সহজে চোখে পড়া সবকিছুই লম্বাদের পক্ষেই বলে মনে হয়। অনেক সময় লম্বা হওয়া মানেই মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী, সুস্থ বা সক্ষম ভাবা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এমন নয়। উচ্চতা শুধু ব্যক্তিত্বের একটি বৈশিষ্ট্য, আর স্বাস্থ্য মানে শুধু উচ্চতা নয়। গবেষণা বলছে, লম্বা হওয়া অনেক সময় শরীরের কিছু অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এবং কিছু নির্দিষ্ট রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ লম্বা হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, এমন ধারণা ভুল বলে তুলে ধরা হয়েছে এনডিটিভি’র একটি প্রতিবেদনে।
বিশেষ করে যারা লম্বা, তাদের জন্য দৈনন্দিন কাজকর্ম, বসার ভঙ্গিমা, হাঁটা বা দৌড়ানো—এসবই শরীরের ওপর আলাদা প্রভাব ফেলে। অনেক সময় লম্বা মানুষ নিজের উচ্চতার কারণে অজান্তে এমন কিছু অভ্যাসে বাধা পড়েন, যা পরে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করে। তাই লম্বা মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
চলুন জেনে নিই লম্বাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন পাঁচটি স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সেগুলো থেকে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়।
হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর ওপর চাপ বেশি
লম্বা মানুষের শরীর বড় হয় এবং রক্তনালিও দীর্ঘ হয়। তাই হৃদযন্ত্রকে রক্তকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, বিশেষ করে মাথার দিকে। এতে হৃদযন্ত্রের কাজের চাপ বাড়ে। গবেষণা অনুযায়ী লম্বাদের মধ্যে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন বা হার্টের অস্বাভাবিক রিদম এবং রক্ত জমাট বাধার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
করণীয়
- নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন
- লবণ ও তেল কম খেতে চেষ্টা করুন
- রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা নিয়মিত করান
জয়েন্ট ও পিঠের সমস্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা
লম্বা মানুষের শরীরের ওজন ও গতি হাঁটু, কাঁধ, কোলহাড় ও মেরুদণ্ডে বেশি চাপ দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ অস্থিসন্ধি ক্ষয়, আর্থ্রাইটিস এবং দীর্ঘমেয়াদী পিঠব্যথার কারণ হতে পারে।
অনেকেই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, যার ফলে পিঠ ও কোমরে চাপ আরও বেড়ে যায়। তাই লম্বাদের জন্য ব্যায়াম ও সঠিক ভঙ্গিমা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা
অনেকে মনে করেন লম্বাদের ফুসফুস বড় হওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস সুবিধা বেশি। তবে অনেক লম্বা মানুষ কাঁধ নিচু করে বসেন বা শ্লচিং করেন, এতে বুকের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। মেরুদণ্ডের সমস্যা থাকলে শ্বাসকষ্টও হতে পারে।
লক্ষণ : হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি বা স্ট্যামিনা কমে যাওয়া।
কী করবেন
- সোজা বসার অভ্যাস করুন
- ডায়াফ্রাম বা পেটের শ্বাসের ব্যায়াম করুন
- নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা সাইক্লিং করুন
খেলাধুলায় চোট এবং লিগামেন্ট সমস্যা
লম্বা মানুষের হাত-পা দীর্ঘ হওয়ায় খেলাধুলায় সুবিধা থাকলেও ঝুঁকিও বাড়ে। দ্রুত ঘুরা, লাফ বা পড়ে গেলে হাঁটু ও গোড়ালির লিগামেন্টে চাপ বেশি পড়ে। ফলে লম্বাদের মধ্যে ACL বা অন্যান্য লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
পরামর্শ
- খেলাধুলার আগে পর্যাপ্ত ওয়ার্ম আপ করুন
- পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করুন
- অতিরিক্ত জোরে ঝাঁপ বা মোচড় দেওয়া থেকে বিরত থাকুন
মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষয় এবং দীর্ঘমেয়াদী পিঠব্যথা
লম্বা মানুষের মেরুদণ্ড বেশি দীর্ঘ হওয়ায় ডিস্কের ওপর চাপ বেশি পড়ে। আজকের সময়ের আধুনিক জীবনযাত্রায় ডেস্কে বসে কাজ করা, মোবাইলে ঝুঁকে থাকা এসব অভ্যাস মেরুদণ্ডের জন্য ক্ষতিকর।
করণীয়
- প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট পর অন্তত ৫ মিনিট হাঁটুন
- সোজা বসুন, পিঠ সাপোর্ট করুন
- কোর পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করুন
লম্বা হওয়া অনেক সুবিধা এনে দেয়, তবে এর সঙ্গে শরীরের ওপর কিছু অতিরিক্ত চাপও আসে। উচ্চতা নিজে রোগ নির্ধারণ করে না, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ভালো ভঙ্গিমা স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লম্বা হওয়া সৌভাগ্যের বিষয় হতে পারে, কিন্তু শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে বড় বিষয়।
মন্তব্য করুন








