রোবট মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে শক্ত, ভারী আর খানিকটা অগোছালো চলাফেরার ছবি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন এমন রোবট বানাতে, যারা শুধু কাজ করবে না, চলাফেরাতেও হবে অনেক বেশি স্বাভাবিক ও সাবলীল।
ব্রিটিশ ইউটিউবার জেমস ব্রুটন এমনই এক ব্যতিক্রমী স্বপ্ন দেখেন। তিনি স্টার ওয়ার্স সিনেমার বিশাল হাঁটা রোবট ‘এট এট’ তৈরি করতে চেয়েছিলেন এবং সেটিতে চড়ে বন্ধুর টেনিস কোর্টে ঘোরার ইচ্ছা ছিল তার। দর্শকের আগ্রহ তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। তবে কাজটি সহজ ছিল না।
এই রোবট চালাতে হলে দরকার ছিল চারটি শক্তিশালী কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য পা। ব্রুটনের চাওয়া ছিল এমন কিছু, যা বড় হলেও হেলেদুলে হাঁটবে না। তাই তিনি মোটর ও গিয়ার ব্যবহার করে এক জটিল ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা রোবটের পা কতটা নড়বে তা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তিনি স্টর্মট্রুপারের পোশাক পরে তার বানানো রোবটের ওপর চড়ে ভিডিও বানান। যদিও তিনি নিজেই স্বীকার করেন, রোবটটি বেশ ধীরে চলে। এখন তিনি দুই পা বিশিষ্ট আরও উন্নত একটি রোবট বানানোর চেষ্টা করছেন, যেখানে ভারসাম্য রাখা আরও কঠিন বলে তিনি মনে করেন।
এই রোবটের কিছু অংশ এমনভাবে বানানো, যা স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে। এগুলো মাটির চাপ শোষণ করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নড়াচড়া সামঞ্জস্য করে নেয়। এর ফলে রোবটের চলাফেরা কিছুটা হলেও মসৃণ হয়।
রোবটকে নড়াচড়া করাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলো অ্যাকচুয়েটর। এগুলো রোবটের হাত, পা বা শরীরের বিভিন্ন অংশ চালায়। সাধারণত অ্যাকচুয়েটর সামনে পেছনে চলে বা ঘুরতে পারে।
এই অ্যাকচুয়েটর যত উন্নত হবে, রোবট তত বেশি নিখুঁতভাবে নড়াচড়া করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খুব অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানই এখনো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী অ্যাকচুয়েটর বড় পরিসরে তৈরি করতে পারে। আর এগুলো এখনো প্রাণীর পেশির মতো কার্যকর হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে রোবট তৈরিতে ডিসি মোটর ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো ফ্যান বা চাকার মতো ঘূর্ণনের কাজে ভালো, তবে মানুষের মতো ভার তোলা বা ধাক্কা দেওয়ার কাজে ততটা উপযোগী নয়। মানুষের চলাফেরায় শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের যে সমন্বয় দরকার, তা এখনকার মোটর দিয়ে পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।
নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, একটি রোবটের হাত আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রয়োজন হলে সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে থামানো বা উল্টো দিকে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হওয়া দরকার। অনেক অ্যাকচুয়েটরে এই ক্ষমতা নেই।
এর পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত রোবটের আরেক বড় সমস্যা হলো ব্যাটারি। অল্প সময়েই চার্জ শেষ হয়ে যায়। আবার খুব ছোট আকারের মোটর বেশি গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
বর্তমানে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন নতুন প্রজন্মের অ্যাকচুয়েটর নিয়ে কাজ করছে। লক্ষ্য হলো এমন যন্ত্রাংশ তৈরি করা, যা কম শক্তি খরচে বেশি কাজ করতে পারবে এবং মানুষের পাশে নিরাপদে কাজ করতে পারবে।
কিছু কোম্পানি চায় তাদের নিজস্ব কারখানায় ভবিষ্যতে রোবট ব্যবহার করতে। কারণ অনেক দেশেই শ্রমিক সংকট বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে মানুষকে অন্য কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু গবেষক একেবারেই ভিন্ন পথে হাঁটছেন। তারা তৈরি করছেন নরম রোবট, যেগুলো বাতাসের চাপে নড়ে। এসব রোবটে খুব কম বা কোনো ইলেকট্রনিক্সই থাকে না। এমনকি গাড়ি দিয়ে চাপা দিলেও এগুলো ভেঙে যায় না।
আরেকটি সম্ভাবনাময় ধারণা হলো রাবারের মতো নরম উপাদান দিয়ে অ্যাকচুয়েটর বানানো। বিদ্যুৎ দিলে এগুলো সংকুচিত বা প্রসারিত হয়, অনেকটা পেশির মতো। যদিও এই প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি,কিন্তু গবেষণা থেমে নেই।
আজকের রোবট এখনো মানুষের মতো সাবলীল নয়। তাদের চলাফেরায় এখনো ভারী ভাব, কৃত্রিমতা আর সীমাবদ্ধতা আছে। তবে অ্যাকচুয়েটর প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই চিত্র বদলাচ্ছে।
ভবিষ্যতে রোবট শুধু শক্তিশালী বা দ্রুতই হবে না, তারা আরও মসৃণভাবে হাঁটবে, ভারসাম্য রাখবে এবং মানুষের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করতে পারবে। সেই দিন আসতে সময় লাগলেও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, একদিন রোবটের চলাফেরাতেও দেখা যাবে সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতা।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন








