সাপ্তাহিক ছুটিতে অনেকেই একটু বেশি ঘুমানোর সুযোগ খুঁজে নেন। আমরা জানি, সপ্তাহজুড়ে অনেকেই রাতভর কম ঘুমাই, আর ছুটির দিনে দেরি করে ঘুম দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করি। কিন্তু যদি আগেভাগে একটু বেশি ঘুমাই, পরের ব্যস্ত দিনের ক্ষতি কি তাতে কমানো সম্ভব?
এই ধারণাটিকে বলা হয় ঘুম ব্যাংকিং। অর্থাৎ, সামনে এমন সময় আসছে যখন ঘুম কম হবে বলে জানি, তখন কয়েক দিন আগে বেশি ঘুমিয়ে শক্তি জমিয়ে রাখা। কিছু গবেষক মনে করেন, এতে মস্তিষ্ক আগেভাগে প্রস্তুতি নেয়, ফলে পরের দিন মনোযোগ, স্মৃতি ও পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো থাকে।
ঘুম ব্যাংকিং এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জনপ্রিয়। কেউ পরীক্ষা বা বড় কাজে যাওয়ার আগে বেশি ঘুমানোর পরামর্শ দেন। তবে এটি সত্যিই কার্যকর কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, এটি কি সত্যিই কার্যকর?
এই ঘুম ব্যাংকিং ধারণাটি প্রথম উঠে আসে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায়। গবেষকরা সেনাদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, যারা কয়েকদিন আগে বেশি সময় ঘুমিয়েছিল, তারা পরবর্তীতে খুব কম ঘুমানোর সময়েও তুলনামূলক ভালোভাবে কাজ করতে পেরেছে। তাদের মনোযোগ কম নষ্ট হয়েছে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেও কম সময় লেগেছে।
এরপর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৌশল শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, চিকিৎসক, ক্রীড়াবিদ এবং রাতের শিফটে কাজ করা মানুষের ক্ষেত্রেও কিছুটা উপকার দিতে পারে। কিছু খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে বেশি ঘুম তাদের শারীরিক চাপ কমিয়েছে, আবার কিছু খেলায় পারফরম্যান্স উন্নত হয়েছে।
তবে সব বিজ্ঞানী এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। অনেকের মতে, শরীর আসলে ভবিষ্যতের জন্য ঘুম জমা রাখতে পারে না। বরং মানুষ যখন বেশি ঘুমায়, তখন সে আগের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করে। তাদের মতে, ঘুমকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো ভাবা ঠিক নয়, বরং এটি ক্রেডিট কার্ডের মতো। অর্থাৎ ঘুমের ঋণ জমতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম জমা রাখা যায় না।
ঘুম কেন এত জরুরি, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য আছে। ঘুমের সময় আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক নিজেকে মেরামত করে। সারাদিনে জমে থাকা ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হয়, স্মৃতি গুছিয়ে নেওয়া হয় এবং পরের দিনের জন্য শক্তি তৈরি হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে, শেখার ক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং কাজের গতি ধীর হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম সবচেয়ে উপযোগী। নিয়মিত এর চেয়ে কম ঘুমালে ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
যারা ঘুম ব্যাংকিং চেষ্টা করতে চান, তাদের জন্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ হলো, সামনে ব্যস্ত সময় থাকলে তার এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৬০ মিনিট বেশি ঘুমানোর চেষ্টা করা। এটি সকালে দেরি করে ওঠা বা রাতে একটু আগে ঘুমাতে যাওয়ার মাধ্যমে করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দিনের বেলা ছোট ঘুমও সহায়ক হতে পারে, তবে সেটি যেন রাতের ঘুমে প্রভাব না ফেলে।
তবে সবাই একমত যে, ঘুম ব্যাংকিং কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি কখনোই নিয়মিত কম ঘুমানোর অজুহাত হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত সময়মতো ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের জন্য ঘুম জমা রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। কিছু গবেষণায় এর উপকারের ইঙ্গিত মিললেও এটি যে সবার জন্য একইভাবে কাজ করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ব্যস্ত জীবনে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ঘুম কিছুটা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি হলো প্রতিদিনের জীবনে ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া এবং একটি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা।
সূত্র : বিবিসি
মন্তব্য করুন








