বিয়ে, উৎসব বা বিনিয়োগ- সবখানেই স্বর্ণ বাঙালির জীবনে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বর্ণ কিনতে গেলেই ক্যারেট, হলমার্ক, খাদ, ভরি বা গ্রাম এসব শব্দে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
একটু জানা থাকলে সঠিক মানের স্বর্ণ কেনা যেমন সহজ হয়, তেমনি প্রতারণার ঝুঁকিও কমে। স্বর্ণ কেনার সময় যে বিষয়গুলো জানা দরকার, সেগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
ক্যারেট দিয়ে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা বোঝানো হয়। একটি গহনায় কতটা খাঁটি স্বর্ণ আছে এবং কতটা অন্য ধাতু মেশানো হয়েছে, সেটাই ক্যারেটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
খনি থেকে পাওয়া স্বর্ণ খুবই নরম। তাই সেটিকে সরাসরি গহনা বানাতে ব্যবহার করা যায় না। এই প্রায় শতভাগ খাঁটি স্বর্ণই ২৪ ক্যারেট নামে পরিচিত। এটি সাধারণত কয়েন বা বার হিসেবে সংরক্ষণ বা বিনিয়োগে ব্যবহার হয়।
গহনা বানানোর জন্য এই নরম স্বর্ণর সঙ্গে তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু মেশানো হয়। এই মেশানো অংশকেই বলা হয় খাদ। খাদ যত বেশি, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা তত কম হয় এবং ক্যারেটও কমে যায়।
বিবিসি বাংলা-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৪ ক্যারেট সবচেয়ে খাঁটি হলেও বাংলাদেশে গহনা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ২২ ক্যারেট স্বর্ণ। এই স্বর্ণ প্রায় ৯১.৬৭ শতাংশ খাঁটি এবং গহনা তৈরির জন্য বেশ টেকসই।
২১ ক্যারেট স্বর্ণও দেশে বেশ জনপ্রিয়। এটি ২২ ক্যারেটের তুলনায় আরও শক্ত। দৈনন্দিন ব্যবহারের আংটি, চেইন, ব্রেসলেট বা কানের দুলে এই ক্যারেটের স্বর্ণ বেশি দেখা যায়। সূক্ষ্ম নকশার গহনাতেও এটি ব্যবহার করা হয়।
১৮ ক্যারেট স্বর্ণে থাকে ৭৫ শতাংশ স্বর্ণ এবং বাকি অংশ অন্য ধাতু। হীরা বা দামি পাথর বসানো গহনার জন্য এটি বেশি উপযোগী, কারণ এই ক্যারেটের স্বর্ণ অনেক শক্ত এবং পাথর ভালোভাবে ধরে রাখতে পারে।
অনেকে মনে করেন খাদ মেশানো মানেই স্বর্ণ ভেজাল। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। গহনা টেকসই করার জন্য খাদ মেশানো প্রয়োজন। তবে খাদ বেশি হলে স্বর্ণের মান কমে যায়। তাই কোন ক্যারেটের স্বর্ণ কিনছেন, সেটি জানা জরুরি।
খাঁটি স্বর্ণ চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো হলমার্ক। হলমার্ক হলো গহনার গায়ে খোদাই করা একটি সংখ্যা বা চিহ্ন, যা সোনার মান সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আন্তর্জাতিকভাবে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের জন্য ৯৯৯.৯, ২২ ক্যারেটের জন্য ৯১৬, ২১ ক্যারেটের জন্য ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের জন্য ৭৫০ ব্যবহার করা হয়। এই সংখ্যাগুলো গহনার গায়ে খোদাই করা থাকে।
বাংলাদেশে হলমার্ক করা স্বর্ণ বিক্রি বাধ্যতামূলক হলেও সব জায়গায় তা পুরোপুরি মানা হয় না। তাই গহনা কেনার সময় অবশ্যই ক্যারেট অনুযায়ী হলমার্ক আছে কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া নাইট্রিক এসিড টেস্ট, চুম্বক পরীক্ষা, পানি পরীক্ষা বা সিরামিক প্লেট টেস্টের মতো কিছু প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে। তবে এসব পদ্ধতি শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে।
এক সময় কেডিএম নামে এক ধরনের স্বর্ণ বাজারে প্রচলিত ছিল। এতে গহনা বানানোর সুবিধার জন্য ক্যাডমিয়াম মেশানো হতো। এতে স্বর্ণের মান ঠিক থাকলেও ক্যাডমিয়াম মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সে কারণে বর্তমানে স্বর্ণে ক্যাডমিয়াম মেশানো নিষিদ্ধ।
স্বর্ণের দাম বুঝতে ওজনের একক জানা খুব জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণ ও রুপার ওজন মাপা হয় ট্রয় আউন্স ও গ্রামে। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১.১০ গ্রাম।
বাংলাদেশে স্বর্ণ কেনাবেচায় ভরি, আনা ও রতি শব্দ বেশি পরিচিত। এক ভরি সমান ১১.৬৬ গ্রাম। আট রতি মিলে এক আনা এবং ১৬ আনা মিলে এক ভরি।
যদিও ক্রেতাদের সুবিধার জন্য ভরি বা আনার হিসাব বলা হয়, বাস্তবে দেশের স্বর্ণের বাজারে দাম নির্ধারণ করা হয় গ্রাম হিসেবেই। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিদিন যে দাম ঘোষণা করে, সেটিও গ্রাম অনুযায়ী নির্ধারিত।
বর্তমানে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো গ্রাম। নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রাখতে গ্রাম হিসেবেই স্বর্ণ কেনাবেচা করা হয়। তাই সঠিক দাম বুঝতে গ্রাম ও ভরির রূপান্তর জানা থাকলে বিভ্রান্তি কমে।
স্বর্ণ কেনার সময় শুধু দামের দিকে তাকালেই চলবে না। ক্যারেট, হলমার্ক এবং ওজনের একক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে নিরাপদ ও সঠিক মানের সোনা কেনা সম্ভব। একটু সচেতন হলেই বড় ক্ষতির ঝুঁকি এড়ানো যায়।
মন্তব্য করুন








