একজন ফরাসি গুপ্তচর, গোপন অভিযানে চোরাচালান করা কিছু গাছের চারা, আর এক অপ্রত্যাশিত সংযোগ; এই তিন মিলেই তৈরি হয়েছে আজ আমরা যে স্ট্রবেরি খাই তার গল্প।
শীতের দিনেও অনেকের মনে ভেসে ওঠে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসের টকটকে লাল, মিষ্টি স্ট্রবেরির স্বাদ। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই ফল সবসময় এমন ছিল না। আকার, রং, স্বাদ— সবই ছিল আলাদা। এমনকি অল্পের জন্য আধুনিক স্ট্রবেরির অস্তিত্ব নাও থাকতে পারত। ১৮শ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকায় এক ফরাসি গুপ্তচরের আকস্মিক আবিষ্কারই বদলে দেয় এর ভাগ্য।
আমরা যাকে স্ট্রবেরি বলি, উদ্ভিদবিজ্ঞানের হিসেবে সেটি প্রকৃত বেরি নয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানে ফল বলতে গাছের পরিপক্ব ডিম্বাশয়কে বোঝায়। যেমন— টমেটো একটি ফল। কিন্তু স্ট্রবেরির লাল মাংসল অংশটি ডিম্বাশয় থেকে নয়, ফুলের দণ্ডের মোটা অংশ থেকে তৈরি হয়। তাই এটিকে সহায়ক বা মিথ্যা ফল বলা হয়।
স্ট্রবেরির গায়ে যে ছোট ছোট হলুদ দানা দেখা যায়, আমরা যেগুলোকে বীজ ভাবি, সেগুলো আসলে আলাদা আলাদা ক্ষুদ্র ফল। প্রতিটি দানার ভেতরেই থাকে একটি করে বীজ। অর্থাৎ বাইরের দানাগুলোই প্রকৃত ফল।
প্রাচীন রোমান লেখায় বুনো স্ট্রবেরির উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে অনেকে বিশ্বাস করতেন, মাটির কাছাকাছি জন্মানো এই ফল সাপ বা ব্যাঙ ছুঁয়ে গেলে তা খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও তা কুসংস্কার ছাড়া কিছুই না। তবে তখনকার দিনে ফ্রিজ না থাকায় স্ট্রবেরি দীর্ঘদিন সতেজ রাখা যেত না, ফলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বুনো স্ট্রবেরি জন্মাত। ইউরোপে চাষ হতো Fragaria vesca, যা মূলত ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হতো। উত্তর আমেরিকায় বুনোভাবে জন্মাত Fragaria virginiana। এ দুই প্রজাতির ফলটি ছিল ছোট, আজকের বাজারে পাওয়া বড় স্ট্রবেরির তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র।

বর্তমান স্ট্রবেরির জিনগত ইতিহাস জটিল। মানুষের দুটি ক্রোমোজোম সেট থাকলেও আধুনিক স্ট্রবেরির আছে সেট আটটি। বহু প্রাকৃতিক সংকরায়ণের ফলে এর জিনগত উৎস নির্ধারণ করা কঠিন।
আধুনিক স্ট্রবেরির গল্প শুরু হয় ফরাসি সেনা কর্মকর্তা আমেদে-ফ্রাঁসোয়া ফ্রেজিয়েরকে ঘিরে। ১৭১২ সালে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই তাকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, বিশেষ করে চিলি ও পেরুতে পাঠান। সেসময় অঞ্চলগুলো ছিল স্পেনের নিয়ন্ত্রণে। তার দায়িত্ব ছিল দুর্গ, বাণিজ্য ও ভূগোল সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করা।
ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে তিনি তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত ফলের সন্ধান পান - বড় আকারের, হালকা লাল বা সাদা রঙের স্ট্রবেরি। এটি ছিল Fragaria chiloensis প্রজাতির। ফল ছিল তুলনামূলক বড় ও কম টক।
ফ্রেজিয়ের ১৭১৬ সালে প্রকাশিত তার ভ্রমণবিষয়ক বইয়ে এই ফলের বর্ণনা দেন। তিনি কিছু চারা ফ্রান্সে নিয়ে আসেন এবং রাজকীয় বাগানে রোপণ করা হয়। এই গাছগুলো দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা টিকে যায়।
পরে যা ঘটে, তা ছিল একেবারে আকস্মিক। চিলির এই প্রজাতি ইউরোপে আগে থেকে থাকা উত্তর আমেরিকার Fragaria virginiana প্রজাতির কাছাকাছি লাগানো ছিল। স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রজাতির মধ্যে সংকরায়ণ ঘটে।

ফলে জন্ম নেয় নতুন এক জাত। যার আকার বড়, রং লালচে, স্বাদ মিষ্টি এবং তুলনামূলকভাবে শক্ত। প্রকৃতির এই স্বতঃস্ফূর্ত সংকরায়ণ থেকেই আধুনিক স্ট্রবেরির জন্ম।
এই নতুন জাত দ্রুত ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে এটি আবার আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেও স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে আরও সংকরায়ণ করা হয়। তবে সমস্যা ছিল সংরক্ষণে। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারজাত করা কঠিন ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও পরিকল্পিত প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড়, শক্ত, বেশি দিন টেকে এমন ও সুস্বাদু জাত তৈরি হতে থাকে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরিকল্পিতভাবে স্ট্রবেরির উন্নয়ন চলছে। উন্নত জাত তৈরির সময় যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় তা হলো:
- উৎপাদন ক্ষমতা
- দীর্ঘ সংরক্ষণযোগ্যতা
- স্বাদ, রং ও আকার
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
- কোন মৌসুমে ফল ধরবে
- শীত সহনশীলতা
বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিন্ন হয়। যেমন ঠান্ডা অঞ্চলে শীত সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ, আর দূরপাল্লায় পরিবহনের জন্য প্রয়োজন শক্ত ফল।
এখনও গ্রীষ্মকালে মাঠে বা পার্কে ছোট আকারের বুনো স্ট্রবেরি দেখা যায়। এগুলো সাধারণত ছোট, নরম ও গোলাকার।
আজ আমরা যে লাল, রসাল, সুস্বাদু স্ট্রবেরি খাই, তা কোনো একক দেশের আবিষ্কার নয়। এটি ইতিহাস, ভৌগোলিক যাত্রা, প্রাকৃতিক সংকরায়ণ ও দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল। ১৮শ শতকের এক গুপ্তচরের গোপন অভিযানে আনা কিছু চারা আর প্রকৃতির এক আকস্মিক মিলন না ঘটলে হয়তো এই ফল আজকের রূপ পেত না।
এক কামড়ে চিবুকে গড়িয়ে পড়া রসের পেছনে তাই লুকিয়ে আছে তিন শতাব্দীর রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
মন্তব্য করুন








