ভোটের ইতিহাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘সবচেয়ে ভালো ফল’ করতে পারে বলে ধারণা করছেন ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিকরা। নির্বাচন ঘিরে তাদের এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ‘বন্ধুত্বের পথে’ হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। ঢাকার এক নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের এক বৈঠকের তথ্যে এ খবর দেয় মার্কিন এই প্রভাবশালী গণমাধ্যম। গত ১ ডিসেম্বর হওয়া গোপন সেই বৈঠকের অডিও হাতে পাওয়ার কথা লিখেছে সংবাদমাধ্যমটি।
মার্কিন কূটনীতিকদের একটি অডিও রেকর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে ওয়াশিংটন পোস্ট একসময় নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় যেতে পারলে জামায়াত যদি বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক কিছু চাপিয়ে দেয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয়, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে দেশটি কী ব্যবস্থা নেবে, সেসবও কূটনীতিকরা ভেবে রেখেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের নয়া দিল্লির ব্যুরো প্রধান প্রানশু ভার্মার করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী বেশ কয়েকবারই নিষিদ্ধ হয়েছে। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছে। প্রথাগতভাবে তারা শরিয়া আইনে দেশ পরিচালনা ও সন্তান-সংসার পরিচালনার জন্য নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার কথা বলে আসছে। যদিও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি তাদের ভাবমূর্তি উদার করছে। দুর্নীতি নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে দলের সমর্থন জোরালো করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা ‘পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি আন্দোলন’ বা ‘নবোদ্যমে’ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ঢাকায় এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, দেশ ‘ইসলামি ধারায় ফিরেছে’। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার নির্বাচনি ইতিহাসের সব থেকে ভালো ফল করতে পারে।
‘আমরা তাদের (জামায়াত ইসলামী) বন্ধু হিসেবে চাই’, বলেন সেই মার্কিন কূটনীতিক।
পরে তিনি বৈঠকে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, তারা জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের (ছাত্রশিবির) টক শো বা প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানাতে ইচ্ছাপোষণ করেন কি না।
কূটনীতিক সাংবাদিকের বলেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের শো-তে যাবে?’
‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে সেই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ না করার কথা লিখেছে ওয়াশিংট পোস্ট।
জামায়াতে ইসলামী শরিয়া আইনের ব্যাখ্যা ‘চাপিয়ে দিতে পারে’, এমন ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না এ কূটনীতিক। তবে তিনি বলছেন, ওয়াশিংটনের হাতে ‘প্রভাব খাটানোর মতো’ এমন কিছু আছে, যা প্রয়োজনে তারা ব্যবহারের জন্যও প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, ‘সহজ কথায়, আমি মনে করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দেবে। আর যদি দলটির নেতারা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পদক্ষেপ নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে।’
এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া বিবৃতিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, ‘ডিসেম্বরে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল। তখন অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই বেছে নিক, তার সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।’
এ ব্যাপারে জামায়াতের ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘গোপন কূটনৈতিক বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।’
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এগুলো তো একটি পত্রিকা ও তাদের একজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ। দেশের পরিস্থিতি একটি প্রতিবেদনে কার্যত উঠে আসে না।’
তিনি বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন, আমাদের মাঝ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, সংস্কার হয়েছে, বিচারের কার্যক্রম চলছে, সব মিলিয়ে অনেকেই এ ধরনের প্রতিবেদন করেছে। আল জাজিরাও করেছে, তাদের প্রতিবেদনেও চোখ বুলিয়েছি। কিন্তু দিনশেষে মানুষের অবস্থানই মূল।’
মোহাম্মদ রহমান জানান, তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের প্ল্যাটফর্ম’ নিয়ে কাজ করছেন। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে। শরিয়া আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
প্রতিবেদনের প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানোর প্রসঙ্গে তিনি জানান, তারা বিষয়টি পুরো দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি এবং ঢাকায় ‘বেশ কয়েকটি’ বৈঠক করেছে, মোহাম্মদ রহমান দ্য পোস্টকে দেওয়া তার বিবৃতিতে বলেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, শুক্রবার দলের নেতা মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ারের সাথেও ভার্চুয়ালি সাক্ষাৎ করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ওয়াশিংটনের বৈঠক সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠকগুলোকে ‘নিয়মিত কূটনৈতিক কাজের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রতি মার্কিনদের আকৃষ্টতা ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে বিভেদ তৈরি করতে পারে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক সংঘাত, রাশিয়ার তেল ক্রয়, অসমাপ্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং অনেক ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের কারণে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই তলানিতে পৌঁছেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক, বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুবাশার হাসান মনে করেন, শেখ হাসিনার আমলে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ থাকার পর জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনি প্রচারে ব্যাপক গতি পেয়েছে। তারা ‘মূলধারার রাজনীতিতে চলে এসেছে’।
মন্তব্য করুন








