বিজ্ঞান জগতের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো আমরা কি এই মহাবিশ্বে একা, নাকি আমাদের বাইরে কোথাও আরও প্রাণের অস্তিত্ব আছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি আবিষ্কার নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাসার বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ১৪৬ আলোকবর্ষ দূরে একটি নতুন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যা গঠন ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে এইচডি ১৩৭০১০ বি। এটি একটি পাথুরে এক্সোপ্ল্যানেট, অর্থাৎ আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত একটি গ্রহ।
গবেষকদের ধারণা, এই গ্রহটি তার নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বাসযোগ্য অঞ্চল বলতে এমন একটি এলাকাকে বোঝানো হয়, যেখানে তাপমাত্রা উপযুক্ত হলে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা থাকে। আর তরল পানি থাকলে সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তবে এই গ্রহে যদি কোনো ধরনের প্রাণ থেকেও থাকে, তাদের জন্য পরিবেশ বেশ ঠান্ডা হতে পারে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রহের নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের মতো হলেও তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা ও কম উজ্জ্বল। এর ফলে গ্রহটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাইনাস ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৬৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। তুলনা হিসেবে বলা যায়, মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
নাসার বিজ্ঞানীরা কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই গ্রহটি শনাক্ত করেন। কেপলারের দ্বিতীয় মিশন কেটু চলাকালীন গ্রহটি তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে একবার অতিক্রম করে, যাকে ট্রানজিট বলা হয়। মাত্র একটি ট্রানজিট থেকেই বিজ্ঞানীরা গ্রহটির কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা পান।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, গ্রহটি তার নক্ষত্রকে মাত্র ১০ ঘণ্টায় একবার প্রদক্ষিণ করে, যেখানে পৃথিবীর ক্ষেত্রে এই সময়কাল প্রায় ১৩ ঘণ্টা। এত দ্রুত কক্ষপথের কারণে গ্রহটির তাপমাত্রা সাধারণত খুব কম থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে সেটি অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বা এমনকি পানিযুক্ত গ্রহ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নাসার গবেষকরা জানিয়েছেন, এই গ্রহটির প্রায় ৪০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে নক্ষত্রের সংরক্ষিত বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে থাকার। আর তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত বা আশাবাদী বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৫১ শতাংশ। তবে প্রায় সমান সম্ভাবনা রয়েছে যে গ্রহটি পুরোপুরি বাসযোগ্য অঞ্চলের বাইরেও অবস্থান করতে পারে।
গ্রহটি সত্যিই বাসযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটি সহজ কাজ নয়। কারণ পৃথিবীর মতো দূরত্বে কক্ষপথ থাকা গ্রহগুলোর ট্রানজিট খুব কমই দেখা যায়। এ কারণেই পৃথিবীর মতো গ্রহ খুঁজে পাওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতে উন্নত মানের মহাকাশ টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে এই গ্রহ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তখনই বোঝা যাবে, এইচডি ১৩৭০১০ বি সত্যিই প্রাণের জন্য উপযোগী কোনো জগৎ কি না।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আমাদের মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহের সংখ্যা খুব কম নয়। যদিও এখনই বলা যাচ্ছে না যে এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, তবুও এমন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের আশাবাদী করে তুলছে। ভবিষ্যতের গবেষণা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে একদিন হয়তো মানবজাতি জানতে পারবে, আমরা সত্যিই এই বিশাল মহাবিশ্বে একা নই।
সূত্র : ডেইলি মেইল
মন্তব্য করুন








