টেলিভিশনের আবিষ্কার সাধারণত স্কটিশ উদ্ভাবক জন লগি বেয়ার্ডের নামে প্রচলিত। তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তির জন্ম ছিল দীর্ঘ, জটিল এবং বহু উদ্ভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে লন্ডনের একটি ছোট ল্যাবরেটরিতে কয়েক ডজন বিজ্ঞানী জড়ো হয়েছিলেন এক নতুন আবিষ্কার দেখার জন্য। সেখানে ছিল তার, গিয়ার ও নিয়ন আলো দিয়ে তৈরি একটি যন্ত্র, আর ঘরের অন্য পাশে ছিল একটি কাচের পর্দা। হঠাৎ সেই পর্দায় ভেসে উঠল একটি নড়াচড়া করা পুতুলের অস্পষ্ট ছবি। এটিই ছিল জন লগি বেয়ার্ডের তৈরি টেলিভাইজর যন্ত্রের প্রথম সফল প্রদর্শনী।
ছবির মান ছিল ঝাপসা, কিন্তু এটি প্রমাণ করেছিল যে বাতাসের মাধ্যমে সরাসরি ছবি পাঠানো সম্ভব। সেখান থেকেই টেলিভিশনের যাত্রা শুরু।
টেলিভিশন শব্দটি তৈরি হয় প্রযুক্তিটি বাস্তবায়নের অনেক আগেই। উনবিংশ শতাব্দীতে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন, শব্দের পাশাপাশি কি ছবি পাঠানো সম্ভব।
সেই সময় আবিষ্কৃত হয় যে সেলেনিয়াম আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে। কিন্তু তখনকার প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না যে চলমান ছবি পাঠানো সম্ভব হতো।
১৮৮৫ সালে জার্মান উদ্ভাবক পল নিপকো একটি যান্ত্রিক টেলিভিশনের ধারণা পেটেন্ট করেন। তিনি ছিদ্রযুক্ত একটি ঘূর্ণায়মান ডিস্ক ব্যবহার করে ছবি স্ক্যান করার প্রস্তাব দেন। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি বাস্তবে কার্যকর করা যায়নি।
১৯০০ সালে রুশ প্রকৌশলী কনস্টান্টিন পার্সকি প্রথম টেলিভিশন শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু তখনও ছবি দূরত্বে পাঠানোর প্রযুক্তি পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
একাধিক উদ্ভাবকের ভূমিকা
১৯২০-এর দশকে জন লগি বেয়ার্ড নিপকোর ধারণা ব্যবহার করে নতুনভাবে পরীক্ষা শুরু করেন। তিনি আলোর উৎস ও ফটোসেল ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ছবিকে অংশে অংশে স্ক্যান করার উপায় বের করেন।
১৯২৬ সালে তার প্রদর্শনী ইতিহাসে বিশেষ স্থান পায়। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চার্লস ফ্রান্সিস জেনকিন্স এবং বড় বড় কোম্পানি যেমন এটিএন্ডটি ও ওয়েস্টিংহাউসও নিজেদের টেলিভিশন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিল।
এই কারণে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, টেলিভিশনের আবিষ্কার একজনের একক কৃতিত্ব নয়। এটি ছিল সমান্তরালভাবে চলা বহু গবেষণা ও উদ্ভাবনের ফল।
যান্ত্রিক থেকে ইলেকট্রনিক টেলিভিশন
১৯৩০-এর দশকে যান্ত্রিক টেলিভিশনের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আইকোনোস্কোপ ও এমিট্রনের মতো যন্ত্রে ইলেকট্রন বিম ব্যবহার করে ছবি ধারণ ও সম্প্রচার করা সম্ভব হয়। এতে ছবির মান উন্নত হয় এবং সম্প্রচার আরও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেলিভিশন উৎপাদন ব্যাহত হয়। যুদ্ধের পরে শিল্প উৎপাদন বাড়লে টিভি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কীভাবে টেলিভিশন বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলল
১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে টেলিভিশনের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৫০-এর দশকে এটি গণমাধ্যমের শক্তিশালী রূপ নেয়। সংবাদ, নাটক, বিনোদন, ক্রীড়া অনুষ্ঠান সবকিছুই মানুষের ঘরে পৌঁছে যেতে শুরু করে।
টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, সংস্কৃতি ও জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করে। পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে এটি।
বর্তমানে স্মার্টফোন ও অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের যুগে টেলিভিশনের ধরন বদলেছে। তবুও আধুনিক পর্দায় আমরা যে উন্নত মানের ছবি দেখি, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেই প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো থেকেই।
টেলিভিশন একক কোনো ব্যক্তির আবিষ্কার নয়। জন লগি বেয়ার্ডের প্রদর্শনী ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে এর পেছনে ছিল বহু উদ্ভাবক, প্রকৌশলী ও প্রতিষ্ঠানের অবদান। প্রযুক্তির অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের সমন্বয়ে টেলিভিশন আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাস তাই বলে, বড় আবিষ্কার প্রায়ই একাধিক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। টেলিভিশনের গল্পও তার ব্যতিক্রম নয়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
মন্তব্য করুন








