পৃথিবী থেকে প্রায় ১১৬ আলোকবর্ষ দূরে একটি সৌরজগতের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যা প্রচলিত গ্রহ গঠনের ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এবং ইউরোপের ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি’ (European Space Agency)-এর টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এই গ্রহমণ্ডলটি শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এলএইচএস ১৯০৩ নামে একটি লাল বামন তারাকে ঘিরে চারটি গ্রহ ঘুরছে। লাল বামন তারাই মহাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই গ্রহগুলোর বিন্যাস একেবারেই অস্বাভাবিক। সবচেয়ে ভেতরের গ্রহটি পাথুরে। তার পরের দুটি গ্যাসীয়। আর সবার বাইরে আবার একটি পাথুরে গ্রহ রয়েছে।
এই বিন্যাস আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের পরিচিত চিত্রের সঙ্গে মেলে না। আমাদের সৌরজগতে সূর্যের কাছে রয়েছে পাথুরে গ্রহ যেমন বুধ,শুক্র, পথিবী ও মঙ্গল। আর দূরে রয়েছে গ্যাসীয় দানব গ্রহ যেমন বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন।
কেন এমনটি অস্বাভাবিক
বিজ্ঞানীদের ধারণা, তরুণ একটি তারাকে ঘিরে গ্যাস ও ধুলোর যে চাকতি তৈরি হয়, সেখান থেকেই গ্রহের জন্ম। তারার কাছাকাছি তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। ফলে পানি বা কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো যৌগ বাষ্পে পরিণত হয়। সেখানে শুধু লোহা ও পাথরের মতো তাপ সহনশীল উপাদান জমাট বেঁধে কঠিন গ্রহ তৈরি করতে পারে। তাই ভেতরের দিকে সাধারণত পাথুরে গ্রহই গড়ে ওঠে।
আর তারার থেকে দূরে, যেখানে তাপমাত্রা কম, সেখানে পানি ও অন্যান্য উপাদান বরফে পরিণত হতে পারে। এই অঞ্চলে গ্রহের কেন্দ্র দ্রুত বড় হয়। এক সময় সেটি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ ভর অর্জন করলে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম টেনে নেয়। এভাবেই গ্যাসীয় দানব গ্রহ তৈরি হয়।
কিন্তু এলএইচএস ১৯০৩ ব্যবস্থায় দেখা গেছে, দুটি গ্যাসীয় গ্রহের বাইরে রয়েছে আবার একটি বড় পাথুরে গ্রহ। এই গ্রহটির নাম এলএইচএস ১৯০৩ ই। এর আকার পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ বড়। এ ধরনের গ্রহকে বৃহৎ পৃথিবী বলা হয়।
কীভাবে সম্ভব হলো
গবেষকরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, হয়তো গ্রহগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে বাইরের পাথুরে গ্রহটি তৈরি হয়েছে। অথবা কোনো গ্যাসীয় গ্রহ তার বাইরের আবরণ হারিয়ে পাথুরে রূপ নিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণের পর এই সম্ভাবনাগুলোকে বাতিল করা হয়।
তারা যে ব্যাখ্যাটি সামনে এনেছেন, তাকে বলা হচ্ছে গ্যাস-স্বল্প গঠন প্রক্রিয়া। এই ধারণা অনুযায়ী, গ্রহগুলো একের পর এক তৈরি হয়েছে এবং ভেতরের গ্রহটি আগে, তারপর ধীরে ধীরে বাইরেরগুলো গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে বাইরের পাথুরে গ্রহটি তৈরি হয়েছে অনেক পরে, যখন গ্যাস ও ধুলোর মজুত অনেকটাই কমে গিয়েছিল। ফলে এটি গ্যাসীয় দানবে পরিণত হতে পারেনি।
এই আবিষ্কার নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘Science’ এ।
নতুন বিতর্কের সূচনা
বিভিন্ন দেশের গ্রহবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ছোট তারার চারপাশে গ্রহ গঠনের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। অন্য গবেষকরাও বলছেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার উন্মুক্ত ক্ষেত্র।
কিছু গবেষকের মতে, এলএইচএস ১৯০৩ ই গ্রহটিতে ভিন্নধর্মী বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে। তাপমাত্রা তুলনামূলক কম হলে সেখানে পানি ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এই গ্রহ পর্যবেক্ষণ করলে তার বায়ুমণ্ডল ও প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ
মহাবিশ্বে লাল বামন তারা সবচেয়ে বেশি। তাই এ ধরনের তারাকে ঘিরে গ্রহ কীভাবে তৈরি হয়, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নতুন সৌরজগত যেন একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার, যেখানে বিজ্ঞানীরা গ্রহ গঠনের ভিন্ন চিত্র পরীক্ষা করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রহ গঠন একটি জটিল প্রক্রিয়া। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আগের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং নতুন প্রশ্ন তোলে। এলএইচএস ১৯০৩ ব্যবস্থাও তেমনই একটি উদাহরণ, যা আগামী কয়েক বছর ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আলোচনায় থাকবে।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, মহাবিশ্ব এখনও বিস্ময়ে ভরা। আমাদের সৌরজগতের গঠনকে দীর্ঘদিন ধরে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে ধরা হলেও, বাস্তবে গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো আরও বৈচিত্র্যময়। নতুন প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন আরও অপ্রত্যাশিত সৌরজগতের সন্ধান মিলতে পারে, যা গ্রহ ও জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করবে।
মন্তব্য করুন








