মানুষ যদি অন্য কোনো দেশ বা সংস্কৃতিতে বড় হতো, তাহলে কি তার ব্যক্তিত্ব আজকের মতোই থাকত? এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই ‘প্রকৃতি বনাম পরিবেশ’-এর বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তার চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও আচরণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই বয়সে বড় হলেও ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের চিন্তাধারা এক রকম হয় না। কোথাও প্রাণীকে দেখা হয় খাবারের উৎস হিসেবে, কোথাও আবার প্রাণীকে দেখা হয় পরিবারের সদস্য বা ভালোবাসার অংশ হিসেবে। এসব পার্থক্য শিশুদের নৈতিকতা, অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করে। খবর বিবিসি
এই ধরনের অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট হয়, সংস্কৃতি মানুষের মানসিক গঠন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই প্রশ্ন ওঠে, কেউ যদি অন্য পরিবেশে বড় হতো, তাহলে কি তার স্বপ্ন, রুচি, রসবোধ কিংবা জীবনের লক্ষ্য ভিন্ন হতো?
প্রতিটি মানুষের ডিএনএ আলাদা এবং কোথায় জন্ম হয়েছে, তার ওপর ডিএনএর গঠন বদলায় না। তবে গবেষকরা বলছেন, জিনই মানুষের সব কিছু নির্ধারণ করে না।
যমজ সন্তানদের নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বৈশিষ্ট্যের গড়ে প্রায় অর্ধেক জিন দ্বারা প্রভাবিত হয়, আর বাকি অংশ পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির ফল। অর্থাৎ মানুষ কে হবে, তা নির্ধারণে প্রকৃতি ও পরিবেশ দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে জিনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হলেও ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব বেশি কাজ করে। মানুষের মিশুকতা, দায়িত্ববোধ, নমনীয়তা বা নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ অনেকটাই নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর।
একই জিন থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন দেশে বড় হলে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রম আলাদা হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ অনুযায়ী মস্তিষ্কের স্নায়ুপথ তৈরি ও শক্তিশালী হয়।
ক্রস কালচারাল মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে মানুষ নিজেকে ভিন্নভাবে দেখে। পশ্চিমা দেশগুলোতে মানুষ সাধারণত নিজেকে ব্যক্তিগত গুণাবলির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে মানুষ নিজেকে পারিবারিক বা সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমে চিহ্নিত করে।
মস্তিষ্ক গবেষণাতেও এই পার্থক্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিছু সংস্কৃতিতে মানুষ নিজের কথা ভাবলে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়, আবার অন্য সংস্কৃতিতে প্রিয়জনের কথা ভাবলেও একই অংশ সক্রিয় হয়। এতে বোঝা যায়, আত্মপরিচয়ের ধারণাও সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন।
শিশুদের আচরণ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কিছু সমাজে বাবা-মায়ের কথা মানাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার কিছু সমাজে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এসব মূল্যবোধ শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
২০২২ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেসব দেশের মানুষ সাধারণত বেশি সংগঠিত ও কর্তব্যপরায়ণ হয়। অন্যদিকে যেসব সমাজে স্বাধীনতা ও নমনীয়তা বেশি, সেখানে মানুষ নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি তুলনামূলক বেশি আগ্রহী হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, মানুষ আচরণের কারণ কীভাবে ব্যাখ্যা করে। অনেক পশ্চিমা সমাজে আচরণকে ব্যক্তির স্বভাবের ফল হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে কিছু এশীয় সংস্কৃতিতে পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই বিষয়টি শুধু মনোবিজ্ঞানের নয়, দর্শনেরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। কিছু দার্শনিক মনে করেন, মানুষ মূলত একটি জৈবিক সত্তা এবং পরিবেশ বদলালেও তার মূল পরিচয় অপরিবর্তিত থাকে। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, মানুষের পরিচয় সমাজ ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের একটি মৌলিক ভালো সত্তা রয়েছে, যা পরিবেশ বদলালেও পুরোপুরি পরিবর্তিত হয় না। তবে বাস্তবে মানুষের আচরণ ও মূল্যবোধ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়।
সব গবেষণা ও বিশ্লেষণ মিলিয়ে বলা যায়, মানুষ কেবল তার জিনের ফল নয়, আবার শুধু পরিবেশেরও সৃষ্টি নয়। মানুষ গড়ে ওঠে জিন, সংস্কৃতি, সমাজ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সম্মিলিত প্রভাবে। ভিন্ন দেশে বা ভিন্ন সংস্কৃতিতে বড় হলে কেউ পুরোপুরি অন্য মানুষ হয়ে যেত না, তবে তার ব্যক্তিত্বে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা দিত। তাই মানুষকে বুঝতে হলে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হয়।
মন্তব্য করুন








