দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এমন ঘটনার প্রমাণ খুঁজছিলেন। অবশেষে দেখা গেল, প্রয়োজনীয় ছবিগুলো বহু বছর ধরেই সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু কেউ খেয়াল করেননি।
বহু বছরের পর্যবেক্ষণ তথ্য ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা এমন এক ঘটনার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন, যেখানে একটি বিশাল তারা সুপারনোভা বিস্ফোরণ ছাড়াই সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়েছে। এই তথ্য এসেছে নাসার নিও-ওয়াইজ (NEOWISE) মিশনের সংগৃহীত ছবি বিশ্লেষণ করে।
তত্ত্ব থেকে বাস্তব পর্যবেক্ষণ
একসময় নক্ষত্রভর কৃষ্ণগহ্বর ছিল কেবল তাত্ত্বিক ধারণা। ১৯৭৩ সালে প্রথম এমন কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত হওয়ার পর জানা যায়, বৃহৎ তারা জীবনের শেষে সাধারণত সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বর বা নিউট্রন তারায় পরিণত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছিল, সব বড় তারা বিস্ফোরিত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে নিউট্রিনোর প্রভাবে বিস্ফোরণ ঘটার কথা থাকলেও তা ব্যর্থ হতে পারে, ফলে তারা সরাসরি ভেঙে পড়ে কৃষ্ণগহ্বরে রূপ নেয়।
কিন্তু এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া ছিল কঠিন।
অ্যান্ড্রোমিডায় রহস্যময় উজ্জ্বলতা
নিও-ওয়াইজ মূলত গ্রহাণু ও ধূমকেতু খুঁজতে ব্যবহৃত হলেও এটি নিয়মিতভাবে Andromeda Galaxy-এর ছবিও তুলেছিল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিশালয় দে’র নেতৃত্বে একটি দল এসব ছবি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিস্ময়কর একটি বিষয় লক্ষ্য করেন।
২০১৪ সাল থেকে অ্যান্ড্রোমিডার একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল তারা অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং প্রায় দুই বছর সেই অবস্থা বজায় রাখে। এরপর হঠাৎ করে দৃশ্যমান আলোতে মিলিয়ে যায়। ঠিক যেন তারাটি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
এই তারার নাম দেওয়া হয়েছে M31-2014-DS1। প্রাথমিকভাবে এর ভর ছিল সূর্যের প্রায় ১৩ গুণ। তবে তীব্র নাক্ষত্রিক বায়ুপ্রবাহে ভর কমে প্রায় পাঁচ সূর্য ভরে নেমে আসে, ঠিক যখন অবলোহিত উজ্জ্বলতা শুরু হয়।
গবেষকদের মতে, এটি এমন এক ব্যর্থ সুপারনোভা, যেখানে বিস্ফোরণ না ঘটেই তারার কেন্দ্র সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরে ধসে পড়ে।
কীভাবে ঘটল এই ধস
মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারার ভেতরের জটিল ভৌত প্রক্রিয়া - মাধ্যাকর্ষণ, গ্যাসচাপ ও শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের পারস্পরিক প্রভাব বিস্ফোরণ ব্যর্থ করতে পারে। ফ্ল্যাটআয়রন ইনস্টিটিউটের গবেষক আন্দ্রেয়া আন্তোনির মডেলিং ইঙ্গিত দেয়, অভ্যন্তরীণ সঞ্চালন প্রক্রিয়া ধসের সময় ধুলিকণা ছড়িয়ে দেয়। পরে কৃষ্ণগহ্বরে পতিত গ্যাস থেকে নির্গত শক্তি আশপাশের ধুলিকে উত্তপ্ত করে, ফলে অবলোহিত আলো ছড়ায়।
১৯৭০-এর দশকের তাত্ত্বিক পূর্বাভাসেও বলা হয়েছিল, সরাসরি ধস হলে অবলোহিত আভা দেখা যেতে পারে। যদিও তা সুপারনোভার মতো উজ্জ্বল নয়।
সুযোগ হাতছাড়া
ঘটনাটি ঘটার সময় যদি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসত, তবে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে টেলিস্কোপ দিয়ে আরও বিশদ পর্যবেক্ষণ সম্ভব হতো। কিন্তু NEOWISE প্রতি ছয় মাস অন্তর ছবি তুলত, ফলে মধ্যবর্তী সময়ের বিবরণ অজানা থেকে গেছে। এখন এমনকি Hubble Space Telescope-ও কেবল ক্ষীণ পরআভা শনাক্ত করতে পারছে।
তবে ভবিষ্যতে James Webb Space Telescope-এর মতো শক্তিশালী অবলোহিত টেলিস্কোপ দিয়ে বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের ক্ষীয়মাণ আলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিতর্ক রয়েই গেছে
সব জ্যোতির্বিজ্ঞানী এখনই একমত নন। কেউ কেউ বলছেন, দুই তারার সংযুক্তি বা সংঘর্ষও এমন আলোক বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পারে। তবে গবেষক দল বলছে, পর্যবেক্ষণ তথ্য সরাসরি ধসের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যায়।
অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সুপারনোভা নথিভুক্ত হয়েছে, সেটি ১৮৮৫ সালে। তাই এই নতুন পর্যবেক্ষণ হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরাসরি ধসের ঘটনা আমাদের ধারণার চেয়ে বেশি সাধারণ।
মহাবিশ্ব বোঝার নতুন জানালা
মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে বিখ্যাত লাল অতিদানব তারা বেটেলজিউজ কবে বিস্ফোরিত হবে। কিন্তু এই আবিষ্কার মনে করিয়ে দেয়, সব বিশাল তারা নাটকীয় বিস্ফোরণে শেষ হয় না।
এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে সাইন্স-এ (Science) সাময়িকীতে।
একটি বিশাল তারা নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল - কোনো আলোড়ন, কোনো আতশবাজির মতো বিস্ফোরণ ছাড়াই। বহু বছর পর পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, তারা মহাবিশ্বের এক বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন।
এই আবিষ্কার শুধু একটি ঘটনার প্রমাণ নয়; এটি নক্ষত্রের মৃত্যু ও কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ করে দিয়েছে। সামনে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি যুক্ত হলে হয়তো মহাবিশ্বের এমন নিঃশব্দ মৃত্যুর আরও গল্প সামনে আসবে।
মন্তব্য করুন








