চীনের জন্মহার দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর এবারই জন্মহার সবচেয়ে কম বলে টিআরটি নিউজের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে জন্ম হয়েছে মাত্র ৫.৬ জনের। মোট নবজাতকের সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৯ লাখে। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ১৬ লাখ কম, যা ২০২০ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন। এই পরিস্থিতির ফলে চীনের মোট জনসংখ্যা কমেছে ৩৪ লাখ। টানা চতুর্থ বছরের মতো জনসংখ্যা হ্রাসের ঘটনা এটি।
এই পরিসংখ্যান চীনের সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে সরকার একটি পরিবারবান্ধব ও সন্তান জন্মে উৎসাহমূলক সমাজ গড়ার কথা বললেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নগদ আর্থিক সহায়তা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানোসহ নানা প্রণোদনা চালু করলেও জন্মহার বাড়েনি।
২০২৪ সালে চীনে বিয়ের সংখ্যাও রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। ওই বছর মাত্র ৬১ লাখ দম্পতি বিয়ে করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ২০.৫ শতাংশ কম। একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেড়েছে ১.১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে কম জন্মহারের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সন্তান ধারণের উপযুক্ত বয়সী নারীর সংখ্যা কমে যাওয়া, তরুণ প্রজন্মের দেরিতে বিয়ে করা, সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দেওয়া এবং উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ ও চাকরির অনিশ্চয়তা এর মধ্যে অন্যতম। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেকেই পরিবার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
সরকার বিয়ে ও জন্মহার বাড়াতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত সেগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়নি। ২০২৪ সালে চীনের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪০ কোটি, যা ২০২১ সালের পর টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে।
এদিকে জনসংখ্যা কমলেও চীনের অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, চীনের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রথমবারের মতো ১৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে, যা প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকা, মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাওয়া, আবাসন খাতে দীর্ঘ মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিজনিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।
উপসংহার হিসেবে বলা যায়, চীন একদিকে জনসংখ্যা সংকটের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে কম জন্মহার ও বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা দেশটির শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এখন চীনের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন








