একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট দাবি করেছেন যে জেনারেশন জেড বা ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীরা তাদের আগের প্রজন্মের তুলনায় মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলছেন, এর মূল কারণ হলো স্কুলে ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার।খবর ডেইলি মেইল।
ড. জ্যারেড কুনি হোরভাথ, যিনি প্রাক্তন শিক্ষক ও বর্তমানে নিউরোসায়েন্টিস্ট। মার্কিন কংগ্রেসের সিনেট কমিটির সামনে বলেছেন, ডিজিটাল ডিভাইস ও শিক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে জেন জেডের মনোযোগ, স্মৃতি, পাঠ ও গণিত দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা ও মোট জ্ঞানের মান কমে গেছে।
ড. হোরভাথ বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণভাবে গভীরভাবে পড়াশোনা ও মানবিক সংযোগের মাধ্যমে শেখার জন্য তৈরি। কিন্তু এখন শিক্ষার বড় অংশ হয়ে গেছে ছোট ভিডিও, টিকটকের মতো ক্লিপ এবং সারাংশমূলক বাক্য পড়া। এগুলো মস্তিষ্কের প্রকৃত শিক্ষার প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিল নেই।
তিনি আরও বলেছেন, একজন কিশোর সাধারণত দিনভর স্ক্রিনের সামনে থাকে। ফলে এক ঘণ্টার মধ্যে মনোযোগ বিভ্রাট, স্মৃতি কমে যাওয়া এবং গভীর বোঝাপড়া হারানোর প্রবণতা দেখা যায়।
ড. হোরভাথের দাবি অনুযায়ী ২০১০ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই মেধা ও শিক্ষাগত দক্ষতা স্থিতিশীল বা কমতে শুরু করেছে। কারণ ওই সময়ের পর স্কুলে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয়।
তিনি বলেন, দেশগুলো যখন স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে, তখন শিক্ষাগত ফলাফল কমে যায়। তার গবেষণা ৮০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে।
- কম্পিউটার ব্যবহার করে পাঁচ ঘণ্টা পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের স্কোর কম দেখা গেছে
- যুক্তরাষ্ট্রে এক-টু-ওয়ান ডিভাইস প্রোগ্রাম চালু হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ফলাফল স্থির বা কমে গেছে
ড. হোরভাথ জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বজুড়ে একই ধারা দেখা গেছে। মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন ধীরে হয়, তাই ২০১০ সালে শিক্ষার পদ্ধতি বদলেই ফলাফল এত দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে বলে তিনি আশ্চর্য প্রকাশ করেন।
আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক জেন জি তরুণরাই নিজেদের কম দক্ষতা সম্পর্কে সচেতন নন। বরং তারা নিজেদের খুবই বুদ্ধিমান মনে করেন।
ড. হোরভাথের মতে, এখন অনেক স্কুল শিক্ষাকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ শিশুকে যেভাবে শেখানো হচ্ছে, সেটা মস্তিষ্কের প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাচ্চারা কম্পিউটারে কী করে? স্কিম করে। তারা দ্রুত পড়ে ফেলতে চায়। তখন শিক্ষার লক্ষ্য বদলে যায়, আর প্রযুক্তিকে শিক্ষার উপযোগী করে তোলা হয়। এটা প্রগতি নয়, পরাজয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা কংগ্রেসের শোনার সময় কিছু সুপারিশ করেছেন
- ছোটদের স্মার্টফোন ব্যবহার দেরিতে শুরু করা
- প্রয়োজন হলে ছোটদের জন্য ফ্লিপ ফোন ব্যবহার করা
- স্কুলে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করা
- জাতীয়ভাবে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মকানুন তৈরি করা
কিছু দেশ, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো, স্কুলে ‘EdTech’ নিষিদ্ধ বা সীমিত করার মতো নীতি গ্রহণ করেছে।
জেনারেশন জেডের মেধা কমে যাচ্ছে এমন দাবি অনেকের কাছে চমকপ্রদ হলেও প্রযুক্তি ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর চলছে, কিন্তু মস্তিষ্কের শেখার ধরন এখনও অনেকাংশে অপরিবর্তিত। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যত্নসহকারে, যাতে গভীর পাঠ, মানবিক সংযোগ ও মনোযোগ বজায় থাকে।
বাংলাদেশেও এখন শিক্ষা ডিজিটাল হওয়ার পথে। আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাকে প্রযুক্তির চেয়ে বেশি মানুষকেন্দ্রিক রাখা। কেবল ডিভাইস বাড়ালে শিক্ষার মান বাড়ে না, বরং শেখার প্রকৃত গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন








