গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পর আর্কটিক অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে ডেনমার্ক, যা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যের মধ্যেই সেখানে আরও সেনা মোতায়েন করেছে ডেনমার্ক। দেশটির পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে নতুন করে সেনা পাঠানোর ঘটনাকে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডেনিশ গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডিআরের খবরে বলা হয়েছে, রয়্যাল ডেনিশ আর্মির প্রধান পিটার বয়েসেনের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা সোমবার সন্ধ্যায় পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের কানগারলুসুয়াকে পৌঁছান। রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল টিভি২ জানিয়েছে, আর্কটিক অঞ্চলে ৫৮ ডেনিশ সেনা অবতরণ করেছেন। তারা এর আগে পাঠানো প্রায় ৬০ সেনার সঙ্গে যোগ দেবেন।
এর আগে পাঠানো সেনারা ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ নামে একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন। এই মহড়ার লক্ষ্য আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কঠিন পরিবেশে যৌথ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী নতুন সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এই সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই বিশাল আর্কটিক অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করে আসছেন।
সোমবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ড জোর করে দখল করা হতে পারে কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই। এর আগে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরকে পাঠানো এক বার্তায় ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার পর তিনি শুধু শান্তির বিষয় মাথায় রেখে চলতে বাধ্য নন।
আরও পড়ুন: ‘গ্রিনল্যান্ড নয়, ইউরোপের নজর থাকা উচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে’
আরও পড়ুন: গাজায় তুরস্ক ও কাতারকে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত ইসরায়েলের
ডেনমার্ক একাধিকবার জানিয়েছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে গ্রিনল্যান্ড কোনোভাবেই বিক্রির জন্য নয় বলে কোপেনহেগেন স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখলের চেষ্টা করা হলে তা ন্যাটোর ঐক্য ও ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে বলে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সংকটময় পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে ন্যাটোর ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই ন্যাটোর সদস্য।
ন্যাটোর সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিধান গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
সোমবার ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পুলসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎসফেল্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রিনল্যান্ডে একটি যৌথ ন্যাটো মিশন গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতির পরও নেই স্বস্তি, গাজায় ভাইরাস সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ
আরও পড়ুন: এক বছরে ‘বেপরোয়া’ ট্রাম্প
বৈঠক শেষে দেওয়া বিবৃতিতে মার্ক রুটে বলেন, আর্কটিক অঞ্চল সমষ্টিগত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, প্রতিরক্ষা খাতে ডেনমার্কের বাড়তি বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে এবং মিত্ররা একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পুলসেন মিত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব সম্মান করার বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন।
ডেনিশ দৈনিক বেরলিংস্কের এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্রে যুক্ত হতে চান না। মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই তথ্য গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সূত্র : আল-জাজিরা
মন্তব্য করুন








